
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) একসঙ্গে জন্ম নেওয়া পাঁচ সন্তানের মধ্যে দুটিকে হারিয়েছেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর দম্পতি মোস্তাকিম হোসেন ও সামরিনা আক্তার। জন্মের ১৯ দিনের মাথায় এক কন্যা এবং ৩২ দিনের মাথায় এক পুত্রসন্তান মারা গেছে। এখন বেঁচে থাকা বাকি তিনটি শিশুকে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের। টাকার অভাবে অসুস্থ সন্তানদের হাসপাতালে রেখে উন্নত চিকিৎসা দিতে পারছেন না এই দম্পতি।
গত ১১ জুন ঢামেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই পাঁচ শিশুর জন্ম দেন সামরিনা। এর আগে গত ১৪ জুন হাসপাতালে এই দম্পতির সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, স্বাভাবিক অবস্থায় ৩৯ সপ্তাহে শিশুর জন্ম হলেও অতিঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা হওয়ায় চিকিৎসকেরা ৩২ সপ্তাহে সিজারিয়ান সেকশন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় মাত্র ৩০ সপ্তাহে অস্ত্রোপচার করতে হয়। জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে তিনটি ছেলে ও দুটি মেয়ে ছিল। তাদের সবারই জন্মকালীন ওজন ছিল এক কেজির নিচে। বর্তমানে চিকিৎসার সুবিধার্থে এই পরিবার আজিমপুরে একটি ভাড়া বাসায় অবস্থান করছে।
অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কায় বেসরকারি হাসপাতাল থেকে একটি শিশুকে ঢামেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল এবং ২১ দিন পর আরেকটি শিশুকে বাসায় আনা হয়। একপর্যায়ে ঢামেকের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) চারটি শিশু চিকিৎসাধীন ছিল এবং একটি বাসায় ছিল। গত ১ জুলাই হাসপাতালের এনআইসিইউতে থাকা অবস্থায় একটি মেয়েশিশু মারা যায়। এরপর বাকি চারটি শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সবশেষ মারা যাওয়া ছেলেশিশুটির মুখে খাবার নেওয়ার সক্ষমতা ছিল না, তাকে নল দিয়ে খাওয়ানো হতো। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্রের সময় নল খুলে দেওয়া হয়েছিল। বাসায় আনার পরদিন ৪ জুলাই সে অসুস্থ হয়ে পড়লে ঢামেকে নেওয়া হয় এবং নাকে নল লাগিয়ে আবার বাসায় পাঠানো হয়। পরদিন ৫ জুলাই শিশুটি পুনরায় অসুস্থ হলে তাকে আবার ঢামেকে নেওয়া হলেও এনআইসিইউতে শয্যা খালি নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে চিকিৎসকেরা জানান শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। সেখানে ১০ দিন চিকিৎসার পর ১৩ জুলাই শিশুটি মারা যায়।
সন্তানদের চিকিৎসায় ইতিমধ্যেই দোকান বিক্রি ও ঋণ করে ১৬ লাখ টাকা খরচ করে ফেলেছেন বাবা মোস্তাকিম। প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলা মোস্তাকিমের কোনো নিয়মিত আয় নেই। বেসরকারি হাসপাতালে দুটি সন্তানকে রাখার জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে দুই লাখ টাকা অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে বাকি তিন সন্তানের মধ্যে একটি শিশু অসুস্থ। মা সামরিনা আক্তার আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ঢামেক এনআইসিইউতে পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগ থাকলে হয়তো দুটি সন্তানকে হারাতে হতো না। বাকিদেরও হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করাতে চান তারা, কিন্তু এখন আর কোনো টাকা জোগাড়ের পথ পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, ঢামেকের এনআইসিইউতে মাত্র ৩৮টি শয্যা রয়েছে। প্রতিদিন সেখানে ৩০ থেকে ৩৫টি শিশু জন্ম নেয় এবং গড়ে অন্তত ৫টি শিশুকে এনআইসিইউতে ভর্তি করতে হয়। শয্যা খালি হওয়া সাপেক্ষে তুলনামূলক বেশি গুরুতর শিশুদের ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, আড়াই কেজির কম ওজনের শিশুদের অপরিণত বলা হয়, আর এই পাঁচ শিশুর ওজনই ছিল এক কেজির নিচে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসকেরা তাদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করেই ছাড়পত্র দিয়েছিলেন।