
দেশি-বিদেশি স্বাদের মেলবন্ধনে জমজমাট লড়াই আর টানটান উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে পর্দা নামল দেশের প্রথম ফিউশন কুকিং রিয়েলিটি শো 'স্টার শিপ ফিউশন শেফ'-এর। গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে চ্যাম্পিয়নশিপ ও ২৫ লাখ টাকার প্রধান পুরস্কার জিতে নিয়েছেন কুষ্টিয়ার মোহাম্মদ লিখন। প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হয়েছেন চট্টগ্রামের মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল এবং দ্বিতীয় রানারআপের পুরস্কার পেয়েছেন ঢাকার মাইনুদ্দিন হাসান চিশতী। তাঁরা যথাক্রমে ১০ লাখ ও ৫ লাখ টাকা পুরস্কার লাভ করেছেন। সেরা তিন বিজয়ী ছাড়াও প্রতিযোগিতার শীর্ষ দশে থাকা অন্য প্রতিযোগীরা ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে তিন মাসের ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পাচ্ছেন। মাসুমা রহমান নাবিলার উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি প্রতি শুক্রবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে চ্যানেল আই, চরকি এবং প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হয়ে আসছিল।
গ্র্যান্ড ফিনালের চূড়ান্ত পর্বে তিন প্রতিযোগীকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিউশন স্টার্টার, মেইন কোর্স ও ডেজার্ট তৈরি করতে হয়। স্বাদ, সৃজনশীলতা, পরিবেশন শৈলী, রান্নার কৌশল এবং উপকরণের সঠিক ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে বিচারকেরা বিজয়ী নির্বাচন করেন। এই চূড়ান্ত পর্বে নিয়মিত তিন বিচারকের সঙ্গে অতিথি বিচারক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা আফরান নিশো।
প্রতিযোগীদের চমৎকার সব ফিউশন রান্না দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারক অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা আফসানা মিমি। তিনি অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের এই যাত্রাটি অত্যন্ত আনন্দের ছিল। নতুন নতুন রেসিপির স্বাদ নেওয়ার যেমন দারুণ মজা ছিল, তেমনি প্রতি পর্বে একজন করে প্রতিযোগীকে বিদায় দেওয়াটা ছিল কষ্টের। সেরা দশ রন্ধনশিল্পী তাঁদের পছন্দের পেশায় ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পাওয়ায় তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন এবং আশা করেন যে রান্না নিয়ে তাঁদের এই আগ্রহ তাঁদের অনেক দূর নিয়ে যাবে।
প্রতিযোগিতার অন্যতম বিচারক এবং ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টের এক্সিকিউটিভ স্যুস শেফ মো. আসাদুজ্জামান আসাদ প্রতিযোগীদের সৃজনশীলতার প্রশংসা করে জানান, এই আয়োজনে বিচারক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাঁর বেশ কিছু নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। রন্ধনশিল্পে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি এই প্রতিযোগীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখেছেন। আরেকজন বিচারক ডাচ ক্লাব ঢাকার এক্সিকিউটিভ শেফ সৈয়দ তাজাম্মুল হক তারেক গ্র্যান্ড ফিনালের লড়াই প্রসঙ্গে বলেন, প্রাথমিক ৬০ জন প্রতিযোগী থেকে ধাপে ধাপে সেরা ১০ জনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্য থেকে উঠে আসা সেরা তিনজনই অত্যন্ত মেধাবী। রান্নার এই ফিউশন ধারাকে তাঁরা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
গ্র্যান্ড ফিনালেতে অতিথি বিচারক হিসেবে আসা অভিনেতা আফরান নিশো প্রতিযোগীদের তৈরি ফিউশন রেসিপির স্বাদ নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রতিযোগীরা খাসির মাংস দিয়ে স্টার্টার, মেইন কোর্স ও ডেজার্ট তৈরি করেছে, যার স্বাদ ছিল অনন্য। এ ধরনের রান্নার শোতে বিচারক হিসেবে আসা তাঁর জন্য একেবারেই নতুন এক অভিজ্ঞতা ছিল। নিশো রসিকতা করে বলেন, তাঁর মনে হচ্ছিল তিনিও যেন একজন প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নিয়েছেন। এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।
পুরো আট পর্বের এই প্রতিযোগিতাটি উপস্থাপনা করেছেন মডেল ও অভিনয়শিল্পী মাসুমা রহমান নাবিলা। তিনি জানান, অন্য যেকোনো রিয়েলিটি শো থেকে এটি তাঁর কাছে একটু আলাদা ও বিশেষ মনে হয়েছে। সেটে এসে প্রতিযোগীদের সঙ্গে কথা বললেই তাঁর মন ভালো হয়ে যেত। প্রতিযোগীদের মতো তিনিও এই ফিউশন শেফের মঞ্চটাকে ভীষণ মিস করবেন।
গ্র্যান্ড ফিনালের তুমুল লড়াই শেষে চ্যাম্পিয়নের ট্রফি হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কুষ্টিয়ার লিখন। তিনি বলেন, এই অনুষ্ঠানে নির্বাচিত হবেন তা কখনো কল্পনাও করেননি। প্রথম আলোতে যখন সেরা ৬০ রেসিপিদাতার তালিকায় নিজের নাম দেখেছিলেন, তখন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি। ছোটবেলা থেকেই রান্না নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন এবং বিশেষ দিনগুলোতে বাসার রান্নার দায়িত্ব তাঁর ওপরই থাকত। তখন থেকেই রান্না নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু। স্টার শিপ ফিউশন শেফের মতো মানসম্পন্ন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণের পথকে অনেকখানি এগিয়ে দিল।
প্রথম রানারআপ চট্টগ্রামের আবিদ বলেন, এত বড় মঞ্চ থেকে স্বীকৃতি পাবেন তা কখনো ভাবেননি। দীর্ঘ এই পথচলার পুরোটিই ছিল তাঁর জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। দেশের খ্যাতনামা ও অভিজ্ঞ বিচারক এবং শেফদের সঙ্গে কাজ করতে পারাটাকে তিনি জীবনের বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন। দ্বিতীয় রানারআপ ঢাকার মাইনুদ্দিন হাসান চিশতী জানান, সিলেকশন রাউন্ডে অংশ নেওয়ার সময় তাঁর লক্ষ্য ছিল কেবল সেরা দশে পৌঁছানো। ধাপে ধাপে এগিয়ে চূড়ান্ত মঞ্চে তৃতীয় স্থান অর্জন করতে পেরে নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করছেন তিনি। এই অর্জনকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে তিনি ভবিষ্যতে এগিয়ে যেতে চান।
উল্লেখ্য, 'স্টার শিপ ফিউশন কিচেন: সিজন-২' নামের রান্নার অনুষ্ঠান থেকেই মূলত এই 'স্টার শিপ ফিউশন শেফ' রিয়েলিটি শোয়ের উৎপত্তি। আয়োজক প্রতিষ্ঠান স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের চিফ মার্কেটিং অফিসার শোয়েব মো. আসাদুজ্জামান বলেন, স্বাদের দিক থেকে আমাদের দেশীয় খাবার কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। কিন্তু শৈল্পিক পরিবেশন বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো কিছু বিষয়ে ঘাটতি থাকায় রেসিপিগুলো বৈশ্বিক দরবারে সঠিক স্থান পায় না। এই আয়োজনের মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের রন্ধনশিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা। এখান থেকে উঠে আসা শীর্ষ দশ প্রতিযোগী দেশের রন্ধনশিল্পকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
এই ফিউশন কুকিং রিয়েলিটি শোটির মূল পৃষ্ঠপোষক ছিল স্টার শিপ সয়াবিন অয়েল, পাওয়ার্ড বাই আমা আটা-ময়দা-সুজি। সহযোগী পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিল স্টার শিপ চিনি। আয়োজনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ছিল প্রথম আলো ডটকম এবং হসপিটালিটি পার্টনার ক্রাউন Plaza ঢাকা এয়ারপোর্ট। পুরো আয়োজনের ইভেন্ট সহায়তায় ছিল ক্রিস্টাল ইভেন্টস এবং ক্রিয়েটিভ সুপারভিশনে ছিল এফসিবি বিটপী অ্যাডভার্টাইজিং লিমিটেড।