
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মৌলিক শর্তগুলো থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে সরকার। ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ এবং সুদের হার শিথিল না করার মতো শর্তগুলো মানছে না বর্তমান সরকার। এর পরিবর্তে জনবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ, কারণ আইএমএফের শর্তাবলি বাস্তবায়ন করলে তা জনবিরোধী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর শর্তগুলোও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের কোনো জোরালো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভের সঠিক হিসাব প্রকাশ ও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষাতেও সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। বর্তমানে নিট রিজার্ভের হিসাব প্রকাশের বদলে কেবল বিভিন্ন তহবিলের বিনিয়োগ বাদ দিয়ে গ্রস রিজার্ভের তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এর ভিত্তিতে গ্রস রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার এবং বিনিয়োগ বাদ দিয়ে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং আগের সরকারের আমলের লুটপাটের কারণে এর পরিমাণ আরও বাড়ছে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দেশের স্বার্থের পরিপন্থি কোনো শর্ত মেনে আইএমএফের সঙ্গে ঋণচুক্তি করবে না সরকার। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আগের আওয়ামী লীগ সরকারের করা ঋণচুক্তিটি বাতিল করে নতুন করে আলোচনার দিকে এগিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১২ থেকে ১৬ জুলাই আইএমএফের একটি মিশন ঢাকা সফর করে অর্থনীতির সার্বিক তথ্য সংগ্রহ করেছে। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার সাইডলাইনে নতুন ঋণের শর্তাবলি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনার কথা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঝেমধ্যেই হস্তক্ষেপ করছে, যা আইএমএফের ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার শর্তের বিরোধী। আগস্টের শুরুতে ডলারের দাম বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি না রাখার মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছিল, যা বর্তমানে ১২২ টাকা ৭৭ পয়সায় নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও ভোক্তার ওপর চাপ বাড়বে। এছাড়া আগস্টের শুরুতে নীতি সুদের হার কমানো এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ঋণের সুদের হার শিথিল করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা আইএমএফের কঠোর মুদ্রানীতির শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।