
রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক—সবখানেই এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট। বেপরোয়া গতি, সিগন্যাল অমান্য করা এবং উল্টোপথে চলাচলের কারণে এই যানগুলো নগরবাসীর জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভিআইপি সড়কে ট্রাফিক পুলিশের সামনে দিয়েই এসব রিকশার অবাধ চলাচল এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে পড়ে যাত্রী আহত হওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে চার্জ করায় একদিকে যেমন সরকারি রাজস্ব নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের অপচয় বাড়ছে। সব মিলিয়ে এই যন্ত্রদানবকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার এখন একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রস্তুত করছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, রাজধানী ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, ট্রাফিক যানজট নিরসন এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা চলাচলে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। পুরো ঢাকা শহরকে মোট ৮টি নির্দিষ্ট জোনে ভাগ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে ঢাকায় এই অটোরিকশার সংখ্যা গাণিতিক হারে বেড়েছে। রাজনৈতিক শেল্টারে গড়ে ওঠা এসব রিকশা ও গ্যারেজ ব্যবসার সঙ্গে সরকারদলীয় অনেকের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। আগে ট্রাফিক সার্জেন্টরা মূল সড়কে এসব যান দেখলেই জরিমানা করতেন, কিন্তু গত দুই বছরে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ অটোরিকশা রয়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে উঠে এসেছে, যার প্রায় সবগুলোই অনিবন্ধিত।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হলেও সমন্বয়ের অভাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তবে এবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন যৌথভাবে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, পুরো ঢাকা শহরকে ৮টি ভৌগোলিক জোনে ভাগ করা হবে। প্রতিটি জোনের জন্য আলাদা রঙের রিকশা ও ডিজিটাল নম্বর প্লেটসহ কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, যাতে পুলিশ সহজেই চালক ও মালিকের তথ্য শনাক্ত করতে পারে।
এই নীতিমালার অধীনে নির্দিষ্ট জোনের রিকশা অন্য কোনো জোনে প্রবেশ করতে পারবে না। এছাড়া অবৈধ চার্জিং স্টেশন ও বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় পরিবেশবান্ধব সোলার চার্জিং হাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশার মান, কারিগরি সক্ষমতা এবং চালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম জানান, বুয়েটের মাধ্যমে কারিগরি যাচাই-বাছাই করে অটোরিকশাগুলোকে সার্টিফিকেট দেওয়া হবে এবং ঢাকার বাইরের কোনো রিকশা রাজধানীতে চলতে পারবে না। বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ প্রশাসন মনে করছে, সড়ক নিরাপদ রাখতে এবং যানজট কমাতে অটোরিকশা নিবন্ধন ও জবাবদিহির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।