
১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ফলে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের একটি পদ শূন্য হয়েছে। এই আসনটি বিএনপির ভাগে পড়ায় দলটির কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের নেত্রীদের মধ্যে সংসদ সদস্য হওয়ার তীব্র আগ্রহ দেখা দিয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, পরিচিত ও অভিজ্ঞ নেত্রীদের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অনেক নারী নেতা এই দৌড়ে রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ এবার সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন চেয়েও পাননি, আবার কেউ সরাসরি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। মিষ্টির পদত্যাগে নতুন করে সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম আসার পর রাজনৈতিক দায় নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন মিষ্টি। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর গত ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। তবে হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিষ্টি। নিয়ম অনুযায়ী, সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আনুপাতিক হারে রাজনৈতিক দলগুলো সংরক্ষিত নারী আসন পেয়ে থাকে। ফলে শূন্য হওয়া আসনটি বিএনপির ভাগে পড়েছে এবং দলটিই ঠিক করবে নতুন করে কে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন।
জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী, আসন শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন আয়োজনের বিধান রয়েছে। সে হিসাবে আগামী ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও নির্বাচন কমিশন এখনো তফসিল ঘোষণা করেনি। গত ৩০ এপ্রিল বিএনপির মনোনয়নে ৩৬ জন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, যাদের গেজেট প্রকাশিত হয় গত ৩০ এপ্রিল এবং তারা শপথ নেন ৩ মে। দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মধ্যেই সংসদ সদস্য পদ ছাড়েন মিষ্টি।
শূন্য আসনটির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দলটির সহ-মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, যিনি আগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক অনুষ্ঠানে যোগ্য নারীদের দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির উদারতার অভাব রয়েছে বলে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হারুনুর রশিদ বিএনপির মনোনয়ন পেলেও জামায়াতের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় স্বনির্ভরবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রদল নেত্রী অ্যাডভোকেট আসমা আজিজও আলোচনায় রয়েছেন। বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এবং তিনি একাধিক রাজনৈতিক মামলার মুখেও পড়েন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও আইনজীবী শাহানা আক্তার সানুও মনোনয়ন পেতে তৎপর। ফেনীর সোনাগাজীর এই নেত্রী ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে উঠে এসেছেন এবং বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য আয়শা সিদ্দিকা মনির নামও আলোচনায় রয়েছে। বাগেরহাটের রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেত্রী এর আগে সরাসরি সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন এবং ২০২৫ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নারীদের অবদানবিষয়ক বিএনপির একটি কমিটিতেও তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও আইনজীবী শাহিনুর বেগম সাগরও আলোচনায় রয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়নের তালিকায় তার নাম ছিল। এছাড়া মহিলা দলের কেন্দ্রীয় মানব উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক খন্দকার ফারহানা আতিকা, বরিশাল মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনও মনোনয়নপ্রত্যাশী। নাসরিন ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে খালেদা জিয়াসহ নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে বরিশালে বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে ফেরার পথে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয়েছিলেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদা আফরোজ হক সূচিও মনোনয়ন পেতে আগ্রহী, যিনি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাহেনা হীরার নামও আলোচনায় এসেছে, যিনি ২০২২ সালের মে মাসে জেলা বিএনপির সম্মেলনে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সভাপতি রুনা লায়লাও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একটি আসনের বিপরীতে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা এক ডজনের বেশি। দলের অঙ্গসংগঠনে দীর্ঘদিন সক্রিয় নেত্রীদের পাশাপাশি সংসদে ভূমিকা রাখতে সক্ষম যোগ্য নারীদেরও বিবেচনায় নেওয়া হবে। সব দিক বিবেচনা করেই একজনকে বেছে নেওয়া হবে, তবে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তিনি এখনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেননি, ফলে এখন যেসব নাম আলোচনায় আসছে, সেগুলোকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনার পর্যায়েই দেখতে হবে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাহেনা হীরার নামও আলোচনায় এসেছে। ২০২২ সালের মে মাসে জেলা বিএনপির সম্মেলনে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন তিনি। তিনটি সাংগঠনিক সম্পাদক পদের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৩৫ ভোট পেয়েছিলেন হীরা। প্রায় এক যুগ পর অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে কাউন্সিলরদের ভোটে জেলা নেতৃত্বে আসেন তিনি।