
শারদীয় দুর্গোৎসবের সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জের জেএম সেন হল পূজামণ্ডপে গিয়ে ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাত সোয়া আটটার দিকে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয়ই সবার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অন্যরা তাঁদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। তিনি আরও বলেন, গত নির্বাচনে এলাকার প্রতিটি কেন্দ্রে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা উপস্থিত হয়ে ভোট দিয়েছেন।
এর আগে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে সামরিক বিমানে করে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি জেএম সেন হল পূজামণ্ডপে যান, যেখানে মন্দির কর্তৃপক্ষ ও সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রতিনিধিরা তাঁকে বরণ করে নেন। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।
মতবিনিময় সভায় সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন উপস্থিত ব্যক্তিরা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, বিভিন্ন সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ ধর্মীয় বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষা করা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে লাখ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র রক্ষা ও জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে রাজপথে নেমেছেন। নারী-পুরুষ, শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ এতে অংশ নেন।
তারেক রহমান বলেন, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান—ধর্ম যার যার নিজস্ব বিষয়, কিন্তু পরিচয় ও ভোটাধিকারের প্রশ্নে সবাই সমান। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আহত বা শহীদ হওয়ার সময় কেউ কারো ধর্মীয় পরিচয় জানতে চায়নি। মানবিকতার ঊর্ধ্বে কোনো পরিচয় নেই এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। লন্ডনে দীর্ঘ প্রবাস জীবনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু পরিচয় নয়, বরং একজন ব্যক্তি যে এই দেশের নাগরিক—এটাই মুখ্য। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকতে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হলেও লন্ডনে অবস্থানের সময় সেই পরিচয় তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ করেনি। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার ও সুযোগ দেবে, অন্য নাগরিকও তা পাবেন।
রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও সুযোগ সমান উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে একটি শান্তিময় বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তিনি সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন। তাঁর মতে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এই দেশে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা মানুষের পরিচয় বাংলাদেশি।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে চন্দ্রনাথ ধাম জাতীয়করণ, মেধসমনি আশ্রমের উন্নয়ন, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে হিন্দু ফাউন্ডেশনে রূপান্তর এবং একটি স্বতন্ত্র হিন্দু সুরক্ষা বোর্ড গঠন। একইসঙ্গে তিনি ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে থাকা বা আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তির দাবি জানান। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ঘটনায় দায়ের করা মিথ্যা মামলায় কারাগারে থাকা ও পালিয়ে বেড়ানো ব্যক্তিদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে মুক্তির দাবিও জানান তিনি।
অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি আরও বলেন, অতীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি নির্দিষ্ট দলের সমর্থক হিসেবে লেবেল দেওয়া হতো, যা ১২ ফেব্রুয়ারি তারা ভ্রান্ত প্রমাণ করেছেন। তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নন, বরং যারা তাদের দাবি মেনে নেবে এবং পাশে দাঁড়াবে, তাদের সাথেই তারা থাকবেন। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক সময় তাদের ভারতীয় আখ্যা দিয়ে হেয় করা হয়। অথচ তারা এই দেশেরই মানুষ এবং সমতার ভিত্তিতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চান।