
রাজধানী ঢাকার বাতাস ক্রমান্বয়ে বিষাক্ত হয়ে উঠছে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বায়ুদূষণ এখন কেবল হতাশাজনক নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি জরুরি অবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তরায় পিএম ২.৫-এর উপস্থিতি প্রতি ঘনমিটারে ১৪৪ মাইক্রোগ্রাম, যা বাংলাদেশের জাতীয় মানমাত্রার চেয়ে চার গুণ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক সতর্কসীমার তুলনায় প্রায় ২৯ গুণ বেশি। অথচ মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরের নিকুঞ্জ এলাকায় এই মাত্রা ৩৫ মাইক্রোগ্রামের নিচে। এই ব্যবধান প্রমাণ করে যে, ঢাকার কিছু এলাকা বসবাসের ন্যূনতম যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে।
গণপরিবহন খাতের অবস্থাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০টি বাসের মধ্যে ৮টিই পরিবেশগত ও কাঠামোগত ফিটনেসে ব্যর্থ হয়ে ‘লাল কার্ড’ পেয়েছে। কোনো বাসই ‘সবুজ কার্ড’ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। বাসের কেবিনে বিষাক্ত ধোঁয়া প্রবেশ, ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের কালো ধোঁয়া নির্গমন এবং বিআরটিএর বৈধ ফিটনেস সনদের অভাব গণপরিবহন খাতের অকার্যকারিতা স্পষ্ট করে তুলেছে। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও প্রতিনিয়ত এই দূষণের শিকার হচ্ছেন, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্ট অ্যানালাইসিস ২০২৩’ অনুযায়ী, বায়ুদূষণজনিত নানা রোগে প্রতি বছর বাংলাদেশে অন্তত ১ লাখ ৫৯ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। আইকিউএয়ারের বৈশ্বিক তালিকায় ঢাকাকে নিয়মিত শীর্ষ দূষিত শহরের তালিকায় দেখা যায়। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণকাজের অব্যবস্থাপনা এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের দৌরাত্ম্য এই দূষণকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। স্বল্পমেয়াদী সমাধান হিসেবে শুষ্ক মৌসুমে সিটি করপোরেশনগুলোকে প্রধান সড়ক ও নির্মাণাধীন এলাকায় নিয়মিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং উন্মুক্ত মাটিতে ঘাস লাগিয়ে সবুজায়ন বাড়াতে হবে। মূল সমস্যা সমাধানে অনুপযোগী বাসগুলো সড়ক থেকে চিরতরে সরিয়ে নেওয়া এবং ধোঁয়াহীন ইঞ্জিন নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি দ্রুত শেষ করা এবং নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখার আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বিআরটিএ-কে সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে নিয়মিত ঝটিকা অভিযান ও জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢাকার বাতাস পরিষ্কার করা কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি মৌলিক মানবাধিকারের প্রশ্ন। সরকার, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।