
গাজীপুরের শ্রীপুর ও কালিয়াকৈরের তিনটি গ্রামে বাঘের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলার নিজমাওনা, বদনীভাঙ্গা এবং পার্শ্ববর্তী কালিয়াকৈর উপজেলার কাচিঘাটা এলাকায় সম্প্রতি দুটি শাবকসহ বাঘের মতো দেখতে একটি প্রাণীকে বনের ঝোপঝাড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রাতের বেলা রাস্তাঘাট, বাড়িঘর কিংবা মাছের খামারের পাশে প্রাণীটি দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই প্রাণীর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় জনমনে আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে।
নিজমাওনা গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী হাবিবুর রহমান জানান, বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে প্রথমবার রাস্তার পাশে বাঘটিকে দেখতে পান তিনি। প্রাণীটি তার দিকে তাকিয়ে থাকায় তিনি আতঙ্কিত হয়ে কোনোভাবে বাড়ি ফেরেন। পরদিন রাত ৩টার দিকে ঘরের পেছনে শব্দ শুনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখেন, বাঘটি তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি মোবাইল ফোনে ছবি তুলে রাখলেও প্রথমে কেউ বিশ্বাস করবে না ভেবে তা প্রকাশ করেননি। পরে অন্যরাও এটি দেখার কথা জানালে তিনি ফেসবুকে ছবি পোস্ট করেন, যা দ্রুত ভাইরাল হয়।
অন্যদিকে বদনীভাঙ্গা গ্রামের তৈয়বুর রহমান জানান, প্রায় তিন মাস আগে পার্শ্ববর্তী ‘কবির ফিসারীজ’ নামের একটি মাছের খামারে তিনি প্রথম এই প্রাণীটিকে দেখেন। শুরুর দিকে সপ্তাহে দুই-তিন দিন আসলেও এখন সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে, প্রায় প্রতি রাতেই দুটি শাবক নিয়ে মাছের খামারের পাশে আসছে প্রাণীটি। স্থানীয় ইউপি সদস্য আমজাদ ফকির বলেন, দুটি শাবক নিয়ে বাঘটি নিজমাওনা ও বদনীভাঙ্গা এলাকার বনে রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শরীরের ডোরাকাটা দাগ দেখে গ্রামবাসীরা এটিকে বাঘ বলে দাবি করছেন এবং চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
এ বিষয়ে শিলাপাড়া ফরেস্ট বিট অফিসার মো. আব্দুর রহমান জানান, বনে বাঘের মতো প্রাণী ঘুরে বেড়ানোর খবর পেয়ে তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন, তবে নিজে এখনও দেখেননি। তবে শ্রীপুরের রেঞ্জ কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক মোখলেছুর রহমান জানান, প্রথমে কালিয়াকৈরের কাচিঘাটা বনাঞ্চলে প্রাণীটি দেখা গিয়েছিল, এখন সেটি শ্রীপুরের বনাঞ্চলে অবস্থান করছে। ফেসবুকের ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে এটি আসলে ‘ক্লাইডেড লেপার্ড’ বা ‘মেঘলা চিতা বাঘ’।
সহকারী বন সংরক্ষক আরও জানান, ২০১২ সালে বন বিভাগ এই মেঘলা চিতা বাঘকে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এটি সারা বিশ্বে একটি বিরল, বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির প্রাণী। নেপালি শব্দ ‘লামচিতোয়া’ থেকে একে স্থানীয়ভাবে ‘লাম চিতা’ বা ‘গেছোবাঘ’ও বলা হয়, কারণ এটি বেশিরভাগ সময় গাছে কাটায়। এর শরীরে মেঘের মতো ডোরাকাটা দাগ রয়েছে। এটি মূলত একটি নিশাচর ও শান্ত প্রকৃতির প্রাণী, যা রাতে খাবারের খোঁজে বের হয়। মাছ এদের প্রিয় খাদ্য হওয়ায় প্রায়ই মাছের খামারের পাশে এদের দেখা মেলে। তিনি আরও জানান, এই প্রাণীটি অত্যন্ত ভীতু স্বভাবের এবং মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে এই বিলুপ্তপ্রায় দুর্লভ প্রাণীটিকে রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।