
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম অর্ণব ঢাকার একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন এবং মোহাম্মদপুরের বসিলা ওয়েস্ট ধানমণ্ডি হাউজিংয়ে থাকতেন। ১৯শে জুলাই জুমার নামাজ শেষে আন্দোলনে যোগ দেয়ার পর বসিলা ব্রিজের ঢালে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। সেদিন শেখ হাসিনার নির্দেশে মোহাম্মদপুর এলাকায় র্যাবের বিশেষ হেলিকপ্টার টিমের তাণ্ডব দেখা গিয়েছিল এবং র্যাব-২ সদর দপ্তরের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনার দুই মাস পর অর্ণবের মা অজ্ঞাতনামা শতাধিক আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্ত করছেন পিবিআই’র শ্যামলী অফিসের পুলিশ পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম। তিনি জানান, সব আসামি অজ্ঞাত হওয়ায় এবং ঘটনাস্থল থেকে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা ভিডিও না পাওয়ায় আসামি শনাক্ত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যায়নি।
একই দিনে বসিলা ব্রিজের নিচে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বসিলা উত্তরপাড়ার মো. মনসুর। ওই বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তার বড়ভাই আয়নাল হক র্যাবের হেলিকপ্টার টিমসহ পুলিশ ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিলেও দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশ প্রতিবেদন দিতে পারেনি। জুলাই আন্দোলনে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার প্রায় ৮৮ শতাংশ মামলাই এখনো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রেই একই ঘটনার জন্য বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে এবং আসামি হিসেবে প্রবাসী বা মৃত ব্যক্তিদের নামও এসেছে। অনেক মামলার শত শত অজ্ঞাতনামা আসামি শনাক্ত করতে ডিজিটাল ফরেনসিক, মোবাইল লোকেশন ও ভিডিও ফুটেজের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ।
তদন্ত ধীরগতির পেছনে অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য দিতে অনীহা, অনেক ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত না হওয়া এবং হাসপাতালের নথিপত্রের অভাব। এছাড়া মামলাগুলোর রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে তদন্ত কর্মকর্তারা নিরপেক্ষতা ও প্রমাণের মান নিশ্চিত করতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন। পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের পর সারা দেশে মোট ৮০১টি হত্যা মামলা এবং ১ হাজার ৬৪টি হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে, যাতে আসামি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩১ জন। প্রায় দুই বছরে মাত্র ২৫৯টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়েছে, যা মোট মামলার ১৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ঢাকার আদালত ও থানায় দায়ের হওয়া ৭৮৯টি মামলার মধ্যে গত ২১শে জুলাই পর্যন্ত পুলিশ ৩৭টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে, যার মধ্যে ২৮টি হত্যা মামলা। এর মধ্যে মহানগর আদালতে দু’টি মামলার চার্জ গঠন হয়েছে।
পিবিআই বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ২০৮টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে, যার মধ্যে ৮৯টি হত্যা মামলা এবং ১৫৯টি অন্যান্য অভিযোগে মামলা। বর্তমানে পিবিআই’র হাতে ৭১টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কিছু মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলায় রায়ও হয়েছে। তবে সাধারণ আদালতের অধিকাংশ মামলাই এখনো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি এডভোকেট মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, কিছু মামলার চার্জ শুনানি শুরু হয়েছে এবং দ্রুতই বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। পিবিআই’র পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, এজাহারে উল্লেখিত অনেক তথ্য যাচাই করতে গিয়ে তদন্ত পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে এবং লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের মতো বিষয়গুলো সময়সাপেক্ষ।