গুলিবিদ্ধ শাকিলের আর্তনাদ: ‘ভাই, আমার মার নাম্বারটা লেহেন তো…’

প্রকাশিত: ১২:৩৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৪, ২০২৬

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের কাছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন ২১ বছর বয়সী মো. শাকিল আহমেদ। সেই ভয়াবহ মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে দেখা যায়, দুই হাত ও দুই পা ধরে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং রাস্তা জুড়ে ঝরছে রক্ত। সেই মুহূর্তে নিজের বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়ে শাকিল উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে তার মায়ের মুঠোফোন নম্বরটি লিখে রাখতে অনুরোধ করেছিলেন। শাকিল চেয়েছিলেন, তিনি মারা গেলে যেন অন্তত তাঁর মরদেহটি তাঁর মা খুঁজে পান এবং কবর দিতে পারেন। তবে যে নম্বরটি তিনি সেদিন বলেছিলেন, সেটি আসলে তাঁর বড় বোনের ছিল।

শ্যামলীর একটি পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন শাকিল। আন্দোলনের শুরুর দিকে না গেলেও রংপুরের আবু সাঈদ হত্যা ও সাভারে লাশ পোড়ানোর মতো ঘটনা দেখে তিনি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার আগে তিনি নিজেই আন্দোলনের বিভিন্ন মুহূর্ত ভিডিও করেছিলেন। শাকিল জানান, গুলি লাগার সময় তিনি খুব বড় ব্যথার চেয়ে একটি কামড়ের অনুভূতি পেয়েছিলেন। প্যান্টের দিকে তাকিয়ে রক্তে ভেসে যেতে দেখে দৌড়ে অন্য আন্দোলনকারীদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই তিনি পড়ে যান।

শাকিলের বাঁ নিতম্বে গুলি লেগে তলপেট ভেদ করে ডান পাশের কোমরের কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়। চিকিৎসার দীর্ঘ লড়াইয়ে তাকে প্রায় দেড় বছর মলত্যাগের জন্য কোলোস্টমি ব্যাগ ব্যবহার করতে হয়েছে। বর্তমানে মলত্যাগের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় থাইল্যান্ডের চিকিৎসকদের পরামর্শে একটি বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে তাকে মলত্যাগ করতে হয়। এছাড়া ডান পা সারাক্ষণ ঝিমঝিম করার পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

ঘটনার দিন তাকে প্রথমে মিরপুরের আলোক হেলথকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। ৫ আগস্ট তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তখন শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় চারদিকে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার বড় বোন শাকিলা আক্তার অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন এবং জানালা দিয়ে মুখ বের করে জনতাকে জায়গা করে দিতে বলছিলেন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সরকারিভাবে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়, যেখানে আটটি অস্ত্রোপচার করা হয় এবং কোলোস্টমি ব্যাগ অপসারণ করা হয়। তবে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে চিকিৎসা পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই তাকে দেশে ফিরতে হয়।

শাকিলের বাবা মো. সিরাজ হাওলাদার ২০১০ সালে মারা গেছেন। বর্তমানে তিনি মিরপুরে মায়ের সাথে সাবলেট বাসায় থাকেন। সরকার নির্ধারিত ‘এ’ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তিনি এককালীন পাঁচ লাখ টাকা, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে তিন লাখ টাকা এবং মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। নিজের পড়াশোনা পুনরায় শুরু করার পাশাপাশি ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ করে তিনি আয়ের চেষ্টা করছেন। তার মা মোসাম্মৎ সেলিনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছেন। শাকিল বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আক্ষেপ করে বলেন, শুধু ভাতা নয়, বরং আপামর জনতাকে নিয়ে দেশটাকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।