জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক সফর ও কূটনৈতিক সাফল্য

প্রকাশিত: ৬:১৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বমঞ্চে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশের পাশাপাশি অনন্য এক পারিবারিক রেকর্ডও গড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে সরকারপ্রধানের মর্যাদায় জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার এই নজির বিশ্ব রাজনীতিতেও বিরল। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সফর কেবল পারিবারিক রেকর্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, কূটনৈতিক পরিপক্বতা ও অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার ক্ষেত্রেও একটি নতুন মানদণ্ডের সূচনা করেছে।

২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্ক অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলায় তার ঐতিহাসিক প্রথম ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর, টেকসই ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে তার সরকারের 'থ্রি-আর' মডেল বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। এর তিনটি স্তম্ভ হলো—রিকভারি (অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা), রেস্টোরেশন (গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধার) এবং রিকনস্ট্রাকশন (প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্র গঠন)। একইসঙ্গে ফিলিস্তিনের প্রতি অবিচল সমর্থন জানিয়ে এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের ওয়াকআউট আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের জোরালো মানবিক ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির বার্তা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের তথ্যমতে, মাত্র চার কার্যদিবসে প্রধানমন্ত্রী ও তার দল অভাবনীয় ব্যস্ত সময় পার করেছেন। বিশ্বের ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, জাতিসংঘের ৮টি উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে ১১টি প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগসহ মোট প্রায় ৮০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। জ্বালানি নিরাপত্তার রক্ষাকবচ হিসেবে কুয়েতের যুবরাজ, ওমান ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সরবরাহ এবং কম মূল্যে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি আমদানির বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া নিউইয়র্কের জেপিমরগানের সদর দপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সাথে বৈঠকে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার পরবর্তী 'ম্যানুফ্যাকচারিং হাব' ঘোষণা করে আইটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটে ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বোঝা বহনকারী বাংলাদেশ এবার অত্যন্ত জোরালো অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশেষ দূতের সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ৫টি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব করেন, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার ত্বরান্বিত করা এবং পরাশক্তিগুলোকে এক টেবিলে আনার দাবি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সুইডেন ও ইউএনএফপিএ-এর যৌথ উদ্যোগে 'হেলদি বাংলাদেশ' রূপরেখা উন্মোচন করা হয়, যার আওতায় ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী (৮০ হাজার নারী স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ) নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে আলোচনায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য নতুন শ্রমবাজার ও ভিসা সহজীকরণের আশ্বাস মিলেছে। জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ আগামী ২০২৬ সালের নভেম্বরে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় কপ-৩১ সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীর মতে, এই সফর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। অতীতে ১০০-১৫০ জনের বিশাল বহর, রাষ্ট্রীয় বিমান ব্যবহার এবং বিমানবন্দরে শোডাউনের যে সংস্কৃতি ছিল, তা ভেঙে প্রধানমন্ত্রী মাত্র ৩৫ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক ফ্লাইটে (তুর্কিশ ও এমিরেটস) সফর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মূখপাত্র মাহদি আমিন জানান, সরকার এখন এই সফরে উপস্থাপিত নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করবে। প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে, তবে এই সফরের চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করবে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ দেশে আনা এবং জ্বালানি চুক্তির সফল বাস্তবায়নের ওপর।