আসল ইলিশের নামে বিদেশি সার্ডিন-চৌক্কা, বাজারে চলছে ‘রুপালি ধোঁকা’

প্রকাশিত: ৭:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩, ২০২৬

দেশের বাজারে আসল ইলিশের স্বাদ ও সুগন্ধের সুযোগ নিয়ে ভোক্তাদের সাথে প্রতারণা করছে একটি অসাধু চক্র। বিদেশ থেকে আমদানি করা সার্ডিন, চৌক্কা, চন্দনা, চকোরি ও টাকিয়া মাছকে দেশীয় ‘আসল ইলিশ’ হিসেবে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে। ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরের এসব আমদানি করা মাছ ক্রেতাদের কাছে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু বাজারে নয়, নদী ও সাগর থেকে ধরে আনা টাটকা ইলিশের সাথে এসব মাছ মিশিয়েও বিক্রি করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ (এফআইকিউসি) dপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিনিয়ত হিমায়িত সামুদ্রিক মাছ আমদানি হচ্ছে, যার মধ্যে ইলিশের মতো দেখতে মাছও রয়েছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৫০০ টন এবং চলতি মাসে ৮৭ টন সার্ডিনসহ ইলিশের মতো দেখতে বিভিন্ন মাছ আমদানি করা হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ৮০ থেকে ৯০ টন এ ধরনের মাছ ভারত, মিয়ানমার ও ওমান থেকে দেশে আসছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ সহজেই আসল ইলিশ চিনতে পারেন না বলে এই সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্রটি।

ফিশারি ঘাটের ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, এই জালিয়াতির একটি বড় অংশ ঘটে গভীর সমুদ্রে। কোল্ড স্টোরেজ থেকে সার্ডিন, চন্দনা ও চৌক্কার মতো মাছ কিনে ট্রলারে করে গভীর সমুদ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জেলেদের কাছ থেকে কেনা আসল ইলিশের সঙ্গে এই বিদেশি মাছগুলো মিশিয়ে ফেলা হয়। এরপর সেগুলোকে নদী বা সাগরের টাটকা মাছের তকমা দিয়ে ঘাটে আনা হয়। এই নকল-আসল মেশানো মাছের বড় অংশ চলে যায় গ্রামের হাট-বাজার ও শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয়। কেটে রান্না করার পর এগুলো আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

চট্টগ্রামের মাছ আমদানিকারক খায়রুল ইসলাম রুমান জানান, চলতি মাসের ২৩ তারিখ থেকে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে মিয়ানমার ও ওমান থেকে ইলিশের মতো দেখতে মাছ আসছে। তিনি নিজেও সার্ডিন আমদানি করছেন এবং তা প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। তার মতে, ডিমওয়ালা দেশীয় ইলিশের সঙ্গে সার্ডিনের হুবহু মিল রয়েছে এবং চৌক্কা মাছ দেখতে ডিমবিহীন লম্বা ইলিশের মতো। এদিকে মৎস্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ৫২১ কোটি ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকার মাছ আমদানি করা হয়েছে, যেখানে সার্ডিনসহ ইলিশ গোত্রের মাছগুলো ‘অন্যান্য’ তালিকায় রয়েছে।

রাজধানীর কাওরান বাজারের তিন দশকের অভিজ্ঞ মাছ ব্যবসায়ী হিরণ মোল্লা জানান, বরফ দেওয়ার বিশেষ কৌশলে মাছের আকার পরিবর্তন করা সম্ভব। বরফ দিয়ে বেঁধে ডিমওয়ালা ইলিশকে যেমন লম্বাটে করা যায়, তেমনি সার্ডিন ও চৌক্কাকেও আসল ইলিশের মতো আকৃতি দেওয়া হয়। যাত্রাবাড়ীর মৎস্য আড়তের ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া জানান, কিছু ক্রেতা জেনেশুনেও কম দামে এগুলো কেনেন। এসব মাছের শরীর আসল ইলিশের চেয়ে কম রুপালি এবং কিছুটা লালচে হয়। তবে দেশীয় ইলিশের স্বাদ আগের মতো না থাকায় অনেক সময় স্বাদের পার্থক্য ধরা পড়ে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মো. গোলাম মোস্তফা এই কর্মকাণ্ডকে ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, সার্ডিন বা ইলিশ গোত্রের মাছ আমদানি হতেই পারে, তবে সেগুলোকে নিজস্ব নামেই বিক্রি করতে হবে। সাধারণ ক্রেতাদের সচেতন করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের মাছ চেনানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এই প্রতারণা বন্ধে জোরদার বাজার মনিটরিংয়ের দাবি জানান তিনি।

চট্টগ্রামের মাছ আমদানিকারক খায়রুল ইসলাম রুমান বলেন, ভারত থেকে আসা ইলিশ আমদানি চলতি মাসের ২৩ তারিখ থেকে বন্ধ হয়েছে। এখন মিয়ানমার, ওমানসহ কয়েকটি দেশ থেকে ইলিশের মতো দেখতে মাছ আসছে। তিনি নিজেও সার্ডিনসহ ইলিশ গোত্রের মাছ আমদানি করছেন। সার্ডিন ৩০০-৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। তার ভাষ্য, পেটে ডিম থাকা দেশীয় ইলিশের সঙ্গে সার্ডিন মাছটির হুবহু মিল রয়েছে। চৌক্কা কিছুটা লম্বা, যা ডিমবিহীন লম্বা ইলিশের মতো।