চট্টগ্রামে বিদ্যুতের উৎপাদন বেশি তবুও দুর্ভোগ কেন? প্রকাশিত: ১:২৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২৬ চট্টগ্রামে বিদ্যুতের উৎপাদন চাহিদার প্রায় তিন গুণ, যা সন্ধ্যার পিক আওয়ারে ৩ হাজার ৭৪০ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছায়। অথচ নগরবাসীর জন্য বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২ হাজার ৭৬৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, যা আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি। প্রকল্পের অধীনে ২২টি নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ ও ৭টি উপকেন্দ্রের আধুনিকায়নের কাজ এখনো ২০ শতাংশের গণ্ডি পেরোতে পারেনি। এছাড়া ৩ হাজার ৮১২টি ট্রান্সফরমার স্থাপনের বৃহৎ অংশ এখনো বাকি এবং বিতরণ লাইনের প্রায় ২৮ শতাংশ কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। প্রকল্পের ধীরগতি ও দীর্ঘসূত্রতা এখন বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দুই দফা সময় বাড়ানোর পরেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় পিডিবির নিজস্ব পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উপকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা ‘শূন্য’ দেখানো হয়েছে। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত নতুন বা আধুনিকায়নের কোনো কাজই সম্পন্ন হয়নি। ট্রান্সফরমার স্থাপনের ক্ষেত্রেও প্রায় ৭৬ শতাংশ কাজ বাকি থেকে গেছে। প্রকল্পের শুরুর দিকে কেনা যেসব ট্রান্সফরমার লাগানো হয়েছিল, সেগুলোর ওয়ারেন্টি মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন তা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অসম্পূর্ণ কাজের পাশাপাশি প্রকল্পটিতে পাঁচটি গুরুতর অডিট আপত্তিও উঠেছে, যা সরকারি অর্থ অপচয়ের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এসব কাজের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিওবি খাত থেকে কোনো বরাদ্দ না থাকলেও বিভিন্ন অর্থবছরে ধাপে ধাপে অর্থ বরাদ্দ ও ছাড় দেওয়া হয়েছে। হিসাব মতে, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত জিওবি থেকে ৭২৩ কোটি ১৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৭০২ কোটি ৪৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা। এ ছাড়া নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হয়েছে ১৬ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এডিপি/আরএডিপিতে সংস্থান ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংস্থান ছিল ৫২ কোটি ৯০ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এ বছর জিওবি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১০০ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে জিওবি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩১৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে অর্থছাড় হয় ২০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের শুরুতে মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। করোনা মহামারি, পণ্য আমদানিতে বিলম্ব, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা এবং অপর্যাপ্ত বরাদ্দের দোহাই দিয়ে মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রকল্পের ব্যয় দফায় দফায় বেড়ে ২ হাজার ৫০১ কোটি থেকে ২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকায় ঠেকেছে এবং সময়সীমা ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় পণ্য ও সেবা খাতে প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। উপকেন্দ্র নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ ও দখল হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা ছিল প্রধান প্রতিবন্ধকতা। ট্রান্সফরমারের বিষয়ে পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন জানান, সব ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হয়েছে এবং বর্তমানে স্টোরে কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে প্রকল্পের শুরুতে কেনা এসব ট্রান্সফরমার দীর্ঘ সময় অলস পড়ে থাকায় সেগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার পথে। এমনকি স্টোর ব্যালেন্সের সঙ্গে প্রকৃত মজুতের অমিলও পাওয়া গেছে; হাটহাজারী, কক্সবাজার, চকরিয়া, কালুরঘাট ও আনোয়ারায় অনেক সরঞ্জাম পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। বিতরণ লাইন আধুনিকায়নের লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ৫৪১ কিলোমিটারের বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৬৬৮ কিলোমিটার। এছাড়া ৮০ হাজার ৪০০টি খুঁটি স্থাপনের বিপরীতে সম্পন্ন হয়েছে ৩৪ হাজার ৪২০টি। বিতরণ লাইনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ। পরামর্শক সেবার জন্য নতুন করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকা, যা প্রকল্পের প্রাথমিক সক্ষমতা ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তবে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। নথিতে ব্যয় দেখানো হয় ৪৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা। প্রকৃত ব্যয় দেখানো হয় ১৯৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটির ২০২১-২২ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনে ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রায় ৪৪৭ কোটি ৭৭ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫২ টাকার পাঁচটি বড় অডিট আপত্তি এখনো অনিষ্পন্ন। এর মধ্যে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই ৩৬০ কোটি ৪৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬০৫ টাকার কেনাকাটা করা হয়েছে। নিয়ম না মেনে একই ঠিকাদারকে একাধিক কাজ দেওয়া এবং বিলম্ব জরিমানার টাকা আদায় না করায় প্রতিষ্ঠানের ৭ কোটি ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮৬৫ টাকার সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বেসরকারি উৎস থেকে পণ্য কিনে আরও ১৯ কোটি ৫৮ লাখ ৩৭ হাজার ৫১৭ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে পিডিবিকে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানিয়েছেন, নানা প্রতিকূলতার কারণেই প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। SHARES অন্যান্য বিষয়: অনিয়মচট্টগ্রামপিডিবিপ্রকল্পবিদ্যুৎ