জ্বালানি ও ধানের দামে চালের বাজার চড়া, বাড়ল নিত্যপণ্যের খরচ প্রকাশিত: ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২৬ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ধানের চড়া দাম ও মৌসুমি প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চালের দাম বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে চরম সংকটে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়ই চালের দাম উর্ধমুখী। খুচরা বাজারে মানভেদে সরু চাল কেজিপ্রতি ৭৪ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৭২ টাকা। মাঝারি মানের চালের দাম কেজিপ্রতি ৫৫-৬২ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮-৬৫ টাকায় ঠেকেছে। তবে মোটা চালের দাম আগের মতোই কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যে গত এক সপ্তাহে চালের দাম বাড়ার কোনো চিত্র মেলেনি; বরং তাদের হিসাবে সরু চালের দাম কেজিতে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। যদিও এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে টিসিবি স্বীকার করেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও টিসিবির আগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের এই সময়ে মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫৫-৬৫ টাকা এবং সরু চাল ৭৫-৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আড়ত ও মিলগেটে দাম বৃদ্ধির মূল কারণ পরিবহন ও কাঁচামালের খরচ বৃদ্ধি। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি বিক্রেতা মোহাম্মদ শাওন জানান, পাইকারিতে সরু চালের দাম কেজিতে ১ টাকা বেড়ে ৬৬ টাকা এবং মাঝারি চালের দাম ১ টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে ৪৮ টাকা ৫০ পয়সা হয়েছে। বর্তমানে ২৫ কেজির এক বস্তা সরু চাল ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং মাঝারি চাল ১ হাজার ২১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় চালের এক ট্রাক ভাড়া আগের ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৪ হাজার টাকা হয়েছে বলে তিনি জানান। একই বাজারের ব্যবসায়ী মামুনুর রশিদ ও কারওয়ান বাজারের পাইকারি-খুচরা বিক্রেতা মহিউদ্দিন সরকার সাইফুলও পরিবহন ও ধানের বাড়তি দামকে দায়ী করেন। তবে মামুনুর রশিদ উল্লেখ করেন, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চালের দাম এখনো কিছুটা কম। রাজধানীর বাজারে সরবরাহের এ চিত্র তৈরি হয়েছে দূর-দূরান্তের পরিবহন ব্যয় ও আঞ্চলিক মোকামের প্রভাবে। কারওয়ান বাজারের শফিকুল ইসলাম জানান, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন মিলপর্যায়ে বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মতে, ডিজেলের দাম বাড়ার পর দিনাজপুর থেকে চালের ট্রাকভাড়া ট্রাকে ৩ হাজার টাকা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ২ হাজার টাকা বেড়েছে, যার ফলে খুচরায় কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা বাড়াতে হচ্ছে। রাজধানীর নতুন বাজার এলাকার ক্রেতা নওশাদ আলী জানান, সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৬০ টাকায় কেনা আটাশ চাল মাসের শেষে ৬২ টাকা এবং বর্তমানে ৬৪ টাকায় কিনতে হচ্ছে। মিরপুরের বাসিন্দা মারুফ বলেন, প্রতি মাসেই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ায় সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। চাল উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল কুষ্টিয়া ও নওগাঁর ব্যবসায়ীরাও মিলগেটে দাম বাড়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলমালিক সমিতি কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রধান জানান, মিলগেটে গত এক মাসে চালের দাম কেজিতে ১-২ টাকা বেড়েছে এবং সরু চাল জাতভেদে ৫৫-৬৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই সময়ে ধানের দাম মণপ্রতি ১ হাজার ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ২৪০ টাকা হয়েছে। তিনি বলেন, বছরের এই সময়ে ধান বেশি শুকানোর ফলে আর্দ্রতা ও ওজন কমে যাওয়ায় কাঁচামালের খরচ বাড়ে। নওগাঁ ধান-চাউল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা জানান, গত পাঁচ দিনে সরু চালের পাইকারি দাম মণপ্রতি (৩৭.৩২ কেজি) ৩০-৫০ টাকা বেড়ে ২ হাজার ৫০ থেকে ২ হাজার ৮০ টাকায় ঠেকেছে। মৌসুমের শেষ সময়ে কেজিতে ১ থেকে দেড় টাকা বৃদ্ধিকে তিনি স্বাভাবিক বলে অভিহিত করেন। দেশের অন্যতম বৃহৎ চাল উৎপাদন কেন্দ্র কুষ্টিয়ার খাজানগরে প্রশাসনিক পদক্ষেপ সত্ত্বেও বাজার দীর্ঘস্থায়ী শান্ত হয়নি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর খাজানগর মোকামে চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা এবং খুচরায় ৪-৫ টাকা বাড়ার পর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জেলা প্রশাসন ও মিল মালিকদের বৈঠকে মিলগেট মূল্য কেজিপ্রতি ১ টাকা কমানো এবং দুই সপ্তাহ দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু চারদিনের মাথায় মিনিকেট চালের দাম মিলগেটে ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ ও পরে ৭২ টাকায় ওঠে এবং কুষ্টিয়া পৌর বাজারে খুচরায় ৭৪ টাকায় পৌঁছে। সর্বশেষ কুষ্টিয়ার খুচরায় কেজিতে আরো ১-২ টাকা বেড়েছে। কুষ্টিয়ার এক রাইস মিল মালিক ও দেশ এগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল খালেক জানান, ধান, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, প্যাকেজিং ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের দামে চাল সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাজারের এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, ‘এখন চালের দাম বাড়ার কোনো কারণই নেই। আমি মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিচ্ছি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের জানাচ্ছি। এ বিষয়ে সরকার কঠোর।’ প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, মিল মালিকরা সরকারকে চাল দিতে চাইলেও এখন সংগ্রহ করা হবে না, কিছুদিন পর সরকার চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু করলে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হবে। এদিকে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমানোর জোর তাগিদ দিয়েছেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খরচ বাড়লে মানুষের জীবিকায় প্রভাব পড়ে এবং মূল্যস্ফীতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি নিত্যপণ্যের দাম ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে রক্ষায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ডিজেলের কারণে পরিবহন খরচ বাড়লেও সেটিকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম নিতে পারেন না। তিনি দুর্বল বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানান। চালের পাশাপাশি ঢাকার বাজারে সবজি, মাছ ও ডিমের দামও চড়া। ফুলকপি প্রতি পিস ৭০ টাকা, নতুন শিম ১৫০ টাকা কেজি, গোল বেগুন ১২০ টাকা, লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, টমেটো ১২০-১৪০ টাকা এবং বরবটি, ঝিঙা ও করলা ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মূলা ও কচুরমুখি ৮০ টাকা, লাউ ৪০-৬০ টাকা এবং সাধারণ শসা ৫০-৬০ টাকা হলেও দেশি শসা ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সরবরাহ বাড়ায় কয়েক সপ্তাহ আগের ২০০ টাকার কাঁচা মরিচ এখন ১২০-১৪০ টাকায় মিলছে এবং পেঁপে ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। নবোদয় বাজারের ক্রেতা আবু সাঈদ জানান, সামান্য কয়েকটি সবজি কিনতেই বাজেট পার হয়ে যাচ্ছে। মাংস ও মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৮০ টাকা এবং সোনালী মুরগি ৩১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার বিক্রেতা তারেক হোসেন জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে ব্রয়লার ১৮০-২০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে আগের মতোই কেজিপ্রতি ৮০০ টাকায়। ফার্মের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫৫-১৬০ টাকায়, তবে পাড়া-মহল্লায় হালি ৫৫ টাকা হিসেবে ডজন ১৬৫ টাকা পড়ছে। মাছের বাজারে তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা, পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা এবং চাষের শিং ৩০০-৪৫০ টাকা কেজি। মাঝারি রুই ৩০০-৩৫০ টাকা, বড় রুই-কাতলা ৩৮০-৪২০ টাকা, বড় রুই ৪৫০-৫০০ টাকা এবং চিংড়ি ১,০০০-১,৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মাছ বিক্রেতা রমিজ উদ্দিন বলেন, ২০০ টাকার নিচে এখন পাঙাশ ছাড়া অন্য মাছ পাওয়া কঠিন এবং শুক্রবারের বাড়তি চাহিদার কারণে দাম আরো কিছুটা বাড়ে। মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই মাছের বাজারেও ক্রেতাদের বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। তেলাপিয়া কেজিপ্রতি ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা ও রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম আকার ও মানভেদে কেজিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। এ ছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা ও বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কই পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ টাকায়, পোয়া ২৬০ টাকা কেজি দরে। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে। SHARES অন্যান্য বিষয়: খাদ্য মন্ত্রণালয়চালের-দামনিত্যপণ্যপরিবহন খরচবাজার-দরমূল্যস্ফীতি