মেঘালয়ের পাহাড় ও মেঘের দেশে এক অন্যরকম ভ্রমণ

প্রকাশিত: ২:৪১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২৬

২০২২ সালের মাঝামাঝি বর্ষার মৌসুমে ১৫-১৬ জন তরুণ-তরুণীর একটি দল তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে নৌকায় ভ্রমণের সময় কাঁটাতারের ওপারে মেঘালয়ের পাহাড়ের সানুদেশে মেঘ ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বর্ষার শেষ বিকেলের সেই অলৌকিক দৃশ্য তাঁদের মনে পাহাড়ের ওপারে কী আছে, সেই প্রশ্ন জাগিয়েছিল। এরপর ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো মেঘালয়ে পা রাখার সুযোগ হয় তাঁদের। এই ভ্রমণ কেবল জায়গা দেখা নয়, বরং নিজেদের খোঁজার এক অন্তহীন যাত্রা।

ডাউকিতে পৌঁছাতেই দেখা মেলে বহু বছরের পরিচিত শোফার ও গাইড সানি গুরুংয়ের। সানিকে দেখা মানেই এক ধরনের স্বস্তি, কারণ পথের চিন্তা তখন তাঁর ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়। এবার তাঁদের দেখার তালিকায় ছিল উমগটের সাসপেনশন ব্রিজ, যা আগে বাংলাদেশ থেকে দেখে কেবল আক্ষেপই করতে হতো। পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি যখন উপরের দিকে উঠতে থাকে, তখন মেঘের ভেতর দিয়ে চলা এক অলৌকিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। মেঘালয়ের পাহাড়ি পথে হর্নের শব্দ খুবই কম, যানজটের ঝামেলা নেই বললেই চলে।

চেরাপুঞ্জির কুয়াশাচ্ছন্ন পথে নোহকালিকাই ফলসের শব্দ আর পাথুরে মাটির সোঁদা গন্ধ তাঁদের মনে এক গভীর বিষণ্নতা ও উপলব্ধির জন্ম দেয়। গিরিখাতের কিনারায় বসে তাদের মনে হয়েছিল, মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতি ও পাখিদের জীবন যেন ভিন্ন। এই একাকীত্ব ও বিষণ্নতার মাঝে তারা নিজেদের ফেলে আসা ঘর ও সম্পর্কের কথা ভেবে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, যা ছিল পরমাত্মার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম।

মেঘালয়ের ডন বসকো মিউজিয়াম উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। সন্ত জন বসকোর আদর্শে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরের ১৭টি গ্যালারিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার নিখুঁত কোলাজ ফুটে উঠেছে। এরপর দেখা মেলে উমিয়াম লেকের, যাকে স্থানীয়রা ‘বড়াপানি’ বলে। কৃত্রিম এই হ্রদটি মেঘালয়ের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত, যার পাশেই রয়েছে লুমের পিংগাদ বা মেঘালয়ের ‘মিনি পেহেলগাম’।

শিলংয়ের বাইকার্স ক্যাফেতে বসে এক তিব্বতি তরুণীর সাথে পরিচয় হয়, যিনি নিজ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ করেন। সেই ক্যাফেতে বসে পাইনবনের শীতল বাতাসের মাঝে কফি পান করা এবং অজানা মানুষের সাথে জীবনের আলাপ এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে ওঠে। ভ্রমণের শেষ দিকে নতুন এক পাহাড়ি রাস্তা ধরে ফেরার সময় হঠাৎ একটি সেতু চোখে পড়ে, যা দেখে তাদের বিছনাকান্দির পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যায়। দশ-বারো বছর আগে দূর থেকে দেখা সেই সেতুটি যেন তাদের অপেক্ষাতেই ছিল। এই বিভ্রম আর স্মৃতি নিয়েই তাদের সফর শেষ হয়, যা তাদের জীবনের স্রোতে মিশে থাকা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার নাম।