ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষায় চীনের ম্যানপ্যাডস: যুদ্ধের নতুন মোড় প্রকাশিত: ৮:০১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৫, ২০২৬ চীনের তৈরি শত শত কাঁধে বহনযোগ্য বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র (ম্যানপ্যাডস) নীরবে ইরানে পৌঁছে যাওয়া ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উচ্চঝুঁকির সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবিরাম বিমান হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বেইজিং এই গোপন প্রতিরক্ষাসহায়তা প্রদান করেছে। স্বল্প উচ্চতায় উড্ডয়নরত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম এই অস্ত্রগুলো পারস্য উপসাগরে পশ্চিমা আকাশ-আধিপত্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ওয়াশিংটনের দ্রুত আকাশ-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে দীর্ঘস্থায়ী ও অসম যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই অস্ত্র সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়াটি হংকংয়ে নিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ঝংছিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট নীরবে সম্পন্ন করেছে, যা বেইজিংভিত্তিক মূল প্রতিষ্ঠান ঝংছিং বাওশাং গ্রুপের পক্ষে কাজ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পশ্চিম চীনের শিনজিয়াংয়ের উরুমকি থেকে পাকিস্তানের আকাশসীমা এবং মধ্য এশিয়া হয়ে ইরানে পৌঁছানো হয়। এরপর সেগুলো ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ইউনিটগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিলেও, এই পদক্ষেপটি বেইজিংয়ের সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ। এর মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে তেহরানকে বড় ধরনের সামরিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে চাইছে। বর্তমানে ইরানের রাডার নেটওয়ার্ক এবং দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা (এস-৩০০ ও বাভার-৩৭৩) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, এই ম্যানপ্যাডসগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর চারপাশে বিকেন্দ্রীভূত ও টেকসই প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। কিউডব্লিউ-১২ এবং এফএন-১৬ মডেলের এই চতুর্থ প্রজন্মের ম্যানপ্যাডসগুলো আধুনিক পশ্চিমা বিমানবাহিনীর জন্য বড় হুমকি। কিউডব্লিউ-১২-এ রয়েছে মধ্য-ইনফ্রারেড দ্বৈত-ব্যান্ড ডিজিটাল ফিল্টারিং সিকার এবং এফএন-১৬-এ রয়েছে দ্বৈত-বর্ণের ইনফ্রারেড ও অতিবেগুনি রোসেট-স্ক্যান কোয়াসি-ইমেজিং সিকার। এগুলো ম্যাগনেশিয়ামভিত্তিক ফ্লেয়ারের প্রলোভন উপেক্ষা করে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া লেজার ও রেডিওভিত্তিক প্রক্সিমিটি ফিউজ থাকায় এগুলো ছোট ড্রোন বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধেও অত্যন্ত কার্যকর। এই অস্ত্রগুলোর সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা হলো এগুলোর প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয় পরিচালনা পদ্ধতি। কোনো রাডার-তরঙ্গ নির্গত না করায় এগুলো ইলেকট্রনিক সতর্কবার্তা ছাড়াই ছোট মোবাইল দলের মাধ্যমে ব্যবহার করা সম্ভব, যা আক্রমণকারী বিমানের জন্য অদৃশ্য হুমকির পরিবেশ তৈরি করে। বেইজিংয়ের এই স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্ত তাদের কৌশলগত সীমারেখা স্পষ্ট করে, কারণ ভারী ক্ষেপণাস্ত্র পাঠালে তা গোপন রাখা অসম্ভব হতো এবং বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকত। ভূ-অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ইরান চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বেইজিং তেহরানকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে চীন নিশ্চিত করতে চায় যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে আটকে থাকবে এবং ওয়াশিংটনের নজর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত হতে পারবে না। একই সঙ্গে, যুদ্ধক্ষেত্রটি চীনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষার একটি বাস্তব পরীক্ষাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ সামরিক আধুনিকায়নে সহায়ক হবে। ড. জান্নুস টি এইচ সিয়াহানের মতে, এই ম্যানপ্যাডস সরবরাহ ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা মতবাদকে ‘মোজাইক এয়ার ডিফেন্স’ স্থাপত্যের দিকে নিয়ে গেছে, যা পশ্চিমা বিমানশক্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদী সামরিক ও আর্থিক চাপ বজায় রাখতে সক্ষম। SHARES মতামত বিষয়: আকাশ প্রতিরক্ষাইরানক্ষেপণাস্ত্রচীনভূরাজনীতিমধ্যপ্রাচ্য