কুড়িগ্রামের সার সংকট: কৃষকের ক্ষোভ কি কেবলই বিশৃঙ্খলা?

প্রকাশিত: ১১:৩৮ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকেরা ডিলারের গুদাম থেকে ১৯৮ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা সারা দেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি নিছক আইনভঙ্গের ঘটনা হলেও, একে কেবল বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখলে মূল সংকট আড়ালে থেকে যাবে। প্রশ্নটি হওয়া উচিত, কৃষকেরা কেন এমন একটি পথে গেলেন? কেন তাঁদের মনে হলো, সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায্য দামে সার পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই? প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকেরা নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছিলেন না। ডিলারের গুদাম খালি বলা হলেও খোলাবাজারে বেশি দামে সার পাওয়া যাচ্ছিল। অর্থাৎ সার পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল না; বরং সরকারি দামে কৃষকের নাগালের বাইরে ছিল। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কৃষকের কাছে সংকটটি নিছক বাজার-ঘাটতির সমস্যা নয়; এটি বঞ্চনা, প্রতারণা ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতা।

কৃষকের কাছে সার কোনো সাধারণ পণ্য নয়। বীজ, সেচ, শ্রম ও ঋণের সঙ্গে সার সরাসরি যুক্ত ফসল উৎপাদনের অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে। সময়মতো সার না পেলে ফলন কমে যায়, জমির বিনিয়োগ নষ্ট হয়, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং পুরো পরিবারের খাদ্য ও আয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই সার পাওয়ার প্রশ্নটি একজন কৃষকের কাছে জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। সরকারি মূল্যে সার বরাদ্দ থাকলেও যদি তা না মেলে, আর একই সার কালোবাজারে কয়েক গুণ দামে বিক্রি হয়, তবে কৃষকের মনে ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

এ ক্ষোভকে বোঝার জন্য ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ই পি থম্পসনের ‘নৈতিক অর্থনীতি’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। থম্পসন দেখিয়েছিলেন, খাদ্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেই মানুষ প্রতিবাদ করে না; প্রতিবাদ তীব্র হয় তখন, যখন ব্যবসায়ী ও কর্তৃপক্ষ সমাজে প্রচলিত ন্যায্যতার ধারণা ভঙ্গ করে। ভূরুঙ্গামারীর ঘটনায় কৃষকেরা শুধু সার আনেননি, এর মধ্য দিয়ে নৈতিকতাকে প্রশ্ন করেছেন। বাংলাদেশের কৃষকের কাছেও সার এমনই একটি নৈতিক পণ্য। কৃষকের প্রত্যাশা খুবই মৌলিক—কৃষির জন্য বরাদ্দকৃত সার কৃষকের কাছেই যাবে; ডিলার মজুত গোপন করবেন না; প্রশাসন বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে; আর সরকারি ভর্তুকি প্রকৃত কৃষকের কাজে লাগবে। কিন্তু যখন সরকারি ভর্তুকির সার মধ্যস্বত্বভোগী, অসাধু ডিলার বা প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর মুনাফায় পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ভূরুঙ্গামারীর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ১৯৯৫ সালে গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে ন্যায্য দামে সার পাওয়ার দাবিতে কৃষকদের আন্দোলন পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনায় রূপ নেয়। অভিযোগ ছিল, কৃষকদের জন্য নির্ধারিত সার বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। জেমস সি স্কটের ‘দুর্বলের অস্ত্র’ ধারণা দিয়ে এ ঘটনাগুলোর আরেকটি দিক বোঝা যায়। কৃষকেরা সার আমদানি, বরাদ্দ, পরিবহন বা ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন না। ক্ষমতার এই অসমতার মধ্যে তাঁরা ছোট ছোট প্রতিরোধের পথ বেছে নেন: দলবদ্ধ হওয়া, রাস্তা অবরোধ, সরবরাহ আটকে দেওয়া, প্রকাশ্যে অভিযোগ করা কিংবা শেষ পর্যায়ে সরাসরি গুদাম থেকে সার নিয়ে নেওয়া। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে ভূরুঙ্গামারীর কৃষকেরা সত্যিই সার পাননি, অথচ একই সময়ে খোলাবাজারে বেশি দামে সার পাওয়া গেছে, তাহলে তাঁদের কর্মকাণ্ডের পেছনে যে গভীর অবিশ্বাস কাজ করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এ সংকটের সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নও যুক্ত। বিদ্যুৎ-সংকটের অবসান এবং সার সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবিতে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের উদ্যোগে পিপুলবাড়িয়া বাজারে আয়োজিত একটি সমাবেশে রাজনৈতিক কর্মীদের হামলার অভিযোগ উঠেছে। নাগরিকেরা যখন সংগঠিত হয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তাঁরা সংকটের রাজনৈতিক দায়ও সামনে আনেন। তাই সংগঠিত প্রতিবাদকে ভয় দেখিয়ে থামানোর চেষ্টা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা সহযোগী গোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা করতে পারে না। সরকারের দায়িত্ব হলো বিরোধী মত ও প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করা।

সরকারকে প্রথমত ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সার বরাদ্দ, ডিলারের মজুত, বিক্রির পরিমাণ ও সরবরাহের সময়সূচি প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষক প্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়ে স্বচ্ছ তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে। তৃতীয়ত, ডিলারদের মজুত ও বিক্রির হিসাব নিয়মিত যাচাই করে অনিয়মের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়-নির্বিশেষে শাস্তি দিতে হবে। চতুর্থত, কৃষকদের জন্য সহজ অভিযোগের ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ডিজিটাল তালিকা ও মুঠোফোনে বার্তার মাধ্যমে বরাদ্দের তথ্য কৃষকের কাছে পৌঁছানো যেতে পারে, যাতে গোপনীয়তার সুযোগ কমে। সরকারের উচিত কৃষকের বেপরোয়া অবস্থা প্রত্যক্ষ করে নিজেদের ত্রুটির দিকে তাকানো। ন্যায্য বণ্টন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু আইনশৃঙ্খলার ভাষায় এই সংকটের সমাধান হবে না।