জাল টাকার গ্যাংয়ের কৌশলে বলির পাঠা ফুটপাত ব্যবসায়ী মেহেদী

প্রকাশিত: ১০:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২৬

ঢাকা জেলা প্রতিনিধি: ঢাকার আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় জাল টাকা উদ্ধার ও আটকের ঘটনাকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অনুসন্ধান, এজাহারে বর্ণিত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্য বিশ্লেষণে অভিযোগ উঠেছে, জাল টাকা কারবারি চক্রের কৌশলের শিকার হয়ে নিরপরাধ ফুটপাত ব্যবসায়ী মো. মেহেদী হাসান (২৩) মামলার আসামি হয়েছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, মেহেদী কোনো জাল টাকা কারবারের সঙ্গে জড়িত নন। বরং ক্রেতা সেজে আসা একটি চক্র কৌশলে তার কাছ থেকে পণ্য নিয়ে জাল টাকা দেওয়ার পর ঘটনাটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যার পরিণতিতে তিনি নিজেই মামলার আসামি হয়েছেন।

ক্রেতা সেজে এসে জাল টাকা দেওয়ার অভিযোগ

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত শুক্রবার (৩১ জুলাই ২০২৬) রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া ছয়তলা স্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তার পাশে নিজের ফুটপাতের দোকানে পুরোনো মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করছিলেন মেহেদী হাসান।

এ সময় সাথী হাওলাদার (২৫) নামে এক নারী ও তার সঙ্গে থাকা এক পুরুষ ক্রেতা সেজে মেহেদীর দোকানে আসেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সাথী প্রথমে মেহেদীর কাছ থেকে ২০ টাকা দামের একটি হাতের আঙুলের চাড়া কাটার মেশিন এবং ৮০ টাকা দামের একটি ছোট বাচ্চাদের ফ্যান কেনেন। মোট ১০০ টাকার পণ্যের মূল্য পরিশোধ করতে তিনি মেহেদীকে ১ হাজার টাকার একটি নোট দেন।

সাধারণ ক্রেতার দেওয়া টাকা মনে করে সরল বিশ্বাসে নোটটি গ্রহণ করেন মেহেদী। পণ্যের মূল্য ১০০ টাকা রেখে তিনি ক্রেতাকে ৯০০ টাকা ফেরত দেন।

এরপর সাথীর সঙ্গে থাকা পুরুষ ব্যক্তি মেহেদীর দোকানে থাকা একটি পুরোনো মোবাইল ফোন পছন্দ করেন। মোবাইলটির দাম নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যক্তি মোবাইলটির মূল্য পরিশোধের সময় আরও চারটি ১ হাজার টাকার নোট দেন।

পরে মেহেদীর সন্দেহ হলে তিনি বিষয়টি আশপাশের ব্যবসায়ীদের জানান। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পাঁচটি ১ হাজার টাকার নোটই জাল বলে শনাক্ত করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

পুরুষ সহযোগী পালালেও আটক নারী, পুলিশে খবর

ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর সাথী হাওলাদার ও তার সঙ্গে থাকা পুরুষ ব্যক্তি ঘটনাস্থল থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে স্থানীয়দের দাবি। একপর্যায়ে ওই পুরুষ ব্যক্তি দৌড়ে পালিয়ে গেলেও স্থানীয়রা সাথী হাওলাদারকে আটক করে পুলিশে খবর দেন।

এর কিছুক্ষণ পর জামগড়া পুলিশ ক্যাম্পের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ তখন দোকানে থাকা সাথী হাওলাদার এবং সদ্য বিক্রি করা পণ্যের মূল্য হিসেবে পাওয়া টাকা হাতে থাকা দোকানদার মেহেদী হাসানকে আটক করে বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘটনার মূল সন্দেহভাজন পুরুষ সহযোগী পুলিশ আসার আগেই পালিয়ে যান। অন্যদিকে মেহেদী নিজের দোকানেই অবস্থান করছিলেন।

সাথী হাওলাদারকে তার পেশা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি একটি বিউটি পার্লারে কাজ করেন বলে জানান। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে তার কর্মস্থল সম্পর্কেও বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

পাঁচটি নোট উদ্ধারের ঘটনায় প্রশ্ন

ঘটনার আলামত ও পণ্য কেনাবেচার তথ্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

মেহেদীর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া পাঁচটি ১ হাজার টাকার জাল নোটের মধ্যে প্রথম নোটটি দেওয়া হয়েছিল ১০০ টাকা মূল্যের পণ্য কেনার সময়। ওই নোটের বিপরীতে মেহেদী ৯০০ টাকা ফেরত দেন। পরবর্তীতে আরও চারটি জাল নোট দিয়ে ৪ হাজার টাকা মূল্যের পুরোনো মোবাইল ফোন নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, একজন সাধারণ ফুটপাত ব্যবসায়ী নিজের দোকানে পণ্য বিক্রি করে ক্রেতার কাছ থেকে জাল টাকা গ্রহণ করলে সেটি কেন তার কাছে অপরাধমূলকভাবে জাল টাকা রাখার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে?

তাদের দাবি, কম দামের পণ্য কিনে বড় নোট দেওয়া, আসল টাকা ফেরত নেওয়া এবং পরে তুলনামূলক দামি পণ্য কেনার সময় জাল নোট ব্যবহার করা প্রতারণার একটি পরিচিত কৌশল হতে পারে। মেহেদীও এমন একটি কৌশলের শিকার হয়েছেন কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

মেহেদীর বিরুদ্ধে পূর্ব অপরাধের তথ্য নেই বলে দাবি

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে ব্যবসা করে আসছেন মেহেদী হাসান। তার বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য তারা জানেন না।

তাদের আরও দাবি, ঘটনার সময় জাল নোটের বিষয়টি বুঝতে পেরে মেহেদী নিজেই আশপাশের ব্যবসায়ীদের বিষয়টি জানান। পরে স্থানীয়রা ওই নোটগুলো পরীক্ষা করে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে জাল টাকা সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে তার জ্ঞান, উদ্দেশ্য ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-এ ধারায় প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির জাল নোট সম্পর্কে জানা বা জানার কারণ ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে।

মেহেদীর পরিবার ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, তিনি যদি সত্যিই সরল বিশ্বাসে ক্রেতার কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করে থাকেন এবং নোটগুলো জাল বলে জানতেন না, তাহলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ভূমিকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের দাবি

এ ঘটনায় জামগড়া এলাকার ব্যবসায়ী সমিতি ও স্থানীয় সচেতন মহল আশুলিয়া থানা পুলিশ এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের দাবি, ঘটনার সময়ের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হলে ক্রেতা সেজে আসা নারী ও তার পুরুষ সহযোগীর গতিবিধি, টাকা লেনদেন এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

মেহেদীর পরিবার ও সহকর্মীদের অভিযোগ, একজন নিরপরাধ ব্যবসায়ী যেন অন্যায়ভাবে মামলার শিকার না হন এবং প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হয়ে আইনের আওতায় আসেন, সেটিই তাদের প্রধান দাবি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: পুলিশ এজাহারে বর্ণিত মামলা নং- ০২, তারিখ: ৩১/০৭/২০২৬।