অন্ধকার পেরিয়ে আলোর ঠিকানায় মুগদার ভাসমান যৌনকর্মীরা প্রকাশিত: ৭:৪৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২৬ রাজধানীর মুগদার একটি পুরোনো জীর্ণ ভবনের নিচতলায় পা রাখলেই চোখে পড়ে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার কয়েকটি গলিঘর। সেখানে প্রথম ঘরটির দরজায় দাঁড়ালে দেখা যায় একদল ছোট শিশু পরম মনোযোগে বইয়ের পাতায় বাংলা অক্ষর শিখছে। অচেনা মানুষকে দেখেই তারা মিষ্টি হেসে সমস্বরে সালাম জানায়। পাশের দুটি রুমে আরও ২০ থেকে ২৫টি শিশুকে দুপুরের খাবার খাইয়ে দিচ্ছেন কয়েকজন নারী। এই জীর্ণ ভবনের ঘরগুলো আসলে শুধু কোনো সাধারণ ঘর নয়, এটি সমাজের এক অন্ধকার গলি থেকে উঠে আসা নারীদের আলোর ঠিকানায় ফেরার এক অনন্য চত্বর। ভবনটির অন্য প্রান্তে চলছে এক অন্য রকম উদ্যাপন। হাতে সার্টিফিকেট নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন নারী, যার চোখেমুখে এখন আত্মবিশ্বাসের ছাপ। ঘরজুড়ে সাজানো রয়েছে সারি সারি সেলাই মেশিন, আর এক পাশে স্তূপ করে রাখা চাল-ডালের বস্তা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। পরিস্থিতির শিকার হয়ে একসময় যৌনকর্মে জড়িয়ে পড়া এই নারীরা এখন নিয়তির চেনা গণ্ডি পেরিয়ে এক নতুন পরিচয়ের খোঁজে লড়াই করছেন। এই পুরো আয়োজনটি পরিচালনা করছে ‘গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ এবং তাদের বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ‘কল্যাণময়ী নারী সংঘ’। শুধু সেলাই আর হাতের কাজের প্রশিক্ষণই নয়, এই নারীদের সন্তানদের নিরাপদ দেখভালের দায়িত্বও নিয়েছে সংগঠনগুলো। শুরুতে দেখা শিশুরা আসলে এই প্রশিক্ষণার্থী মায়েদেরই সন্তান, বর্তমানে সেখানে এমন ৩৯টি শিশু রয়েছে। এই মানবিক উদ্যোগের পেছনে অন্যতম কারিগর ‘গিভ বাংলাদেশ’-এর executive director আহমেদ ফাহমি। নিজস্ব অর্থায়নে ‘প্রজেক্ট লড়াই’ নামক একটি প্রকল্পের আওতায় মাত্র আটজন নারীকে নিয়ে প্রথম সেলাই প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছিল। প্রকল্পটি মূলত যৌনকর্মীদের পুনর্বাসন কর্মসূচি ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর একটি অংশ। বর্তমানে এই কার্যক্রমের ২৭তম ব্যাচ চলছে, যেখানে প্রতি ব্যাচে গড়ে ২২ জন করে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এ পর্যন্ত ২৪৯ জন নারী এখান থেকে প্রশিক্ষণ শেষ করেছেন। এই পুরো কর্মযজ্ঞের প্রধান ভরসা কল্যাণময়ী নারী সংঘের সভাপতি রিনা আক্তার, যিনি সবার কাছে ‘রিনা আপা’ নামে পরিচিত। মাত্র আট বছর বয়সে গৃহকর্মীর কাজের লোভ দেখিয়ে দালালরা তাঁকে অপহরণ করে পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল। ফরিদপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন ব্রথেলে বিক্রি হওয়ার পর একদিন সেখান থেকে পালিয়ে ঢাকার সদরঘাটে এসে ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে জীবন শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে সেই অন্ধকার জীবন ছেড়ে নিজেকে নিয়োজিত করেন অন্যদের পুনর্বাসনের কাজে। ২০২০ সালে বিবিসির বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীর তালিকায় জায়গা করে নেন রিনা আক্তার। করোনা মহামারির লকডাউনে যখন ভাসমান যৌনকর্মীরা অনাহারে দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন নিজের জমানো সম্বল দিয়ে তাঁদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছিলেন তিনি। এরপর সাময়িক ত্রাণের বদলে স্থায়ী পরিবর্তনের লক্ষ্যে ২০২১ সালে চালু করেন এই সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্র। বাংলাদেশে নির্দিষ্ট ব্রথেল এবং ভাসমান—উভয় ধরনের যৌনকর্মীদের মধ্যেই বেঁচে থাকার সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন। তবে গিভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ও কল্যাণময়ী নারী সংঘের কাজ মূলত ভাসমান যৌনকর্মীদের নিয়ে। ব্রথেলগুলোতে দালাল ও পাচারকারীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট এবং কাল্পনিক ঋণের বোঝার কারণে কাউকে সেখান থেকে বের করে আনা অত্যন্ত কঠিন কাজ। আহমেদ ফাহমি জানান, অনেক সময় ব্রথেল থেকে কোনো মেয়েকে বের করতে হলে রীতিমতো ‘রানি’র কাছ থেকে তাকে কিনে নিতে হয়। প্রশিক্ষণ শেষে এই নারীদের পুনর্বাসনের পথও সহজ নয়। খুব অল্প বয়সে পাচারের শিকার হওয়ায় অনেকেরই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই, যার কারণে বড় গার্মেন্টসগুলো তাঁদের কাজে নিতে চায় না। বিকল্প হিসেবে স্থানীয় ছোট বা মাঝারি কারখানায় প্যান্টের চেইন, বোতাম লাগানো বা জিনস সেলাইয়ের কাজে তাঁদের যুক্ত করা হয়। অনেকে আবার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা এনজিওর ফ্রন্টলাইন কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত তাঁদের ২৭১ জন গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ নারী স্থায়ীভাবে আগের পেশা ছেড়েছেন। বাকি প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী পুরোনো জগতে ফিরে গেছেন, তবে অনেকে সেখান থেকে উত্তোরণের চেষ্টাও করছেন। গিভ বাংলাদেশের এই তরুণ সংগঠক বলেন, ‘একজন নারী যখন অল্প বয়সে এই পেশায় আসেন, তখন তাঁর মাসে ২০ হাজার থেকে ৩৫-৪০ হাজার টাকা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় থাকে।’ সেখানে গার্মেন্টসের চাকরিতে ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকার বেতন দিয়ে জীবন চালানো অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যাচের ২২ জন নারীর মধ্যে ১২ জনের আর্থিক ব্যয়ভার বহন করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন ‘পুষ্পা’ (খানুম’স ব্র্যান্ডের মাধ্যমে) এবং বাকি ১০ জনের দায়িত্ব নিয়েছে ‘আলোকানন্দ ফাউন্ডেশন’। গিভ বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত পোর্টফোলিও ম্যানেজার ফাল্গুনী আহমেদ জানান, এই সেলাই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীদের জন্য তাঁদের ‘বাঘ-বিধবা’ নামের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পুনর্বাসন প্রকল্প রয়েছে। পুনর্বাসনের পাশাপাশি এই নারীদের জন্য বিশেষ ‘মেডিক্যাল ক্যাম্প’-এর আয়োজন করা হয়। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল বা ইনজেকশন ব্যবহারের কারণে তাঁদের শরীরে নানা জটিল রোগ বাসা বাঁধে। ক্যাম্পে তাঁদের এইচআইভি স্ক্রিনিং, বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সারভাইক্যাল ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এই মহৎ কাজ করতে গিয়ে রিনা আক্তারকে স্থানীয় রাজনীতি ও মানুষের নানা বাধা এবং কুৎসার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেকে একে তাঁর নতুন ‘ব্যবসা’ বলেও অপবাদ দিয়েছে। কিন্তু রিনা আক্তার জানেন, এই অন্ধকার জগৎ কখনো পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তাই তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে চান এবং ভবিষ্যতে নিজেদের একটি বড় ফ্যাক্টরি গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। সদরঘাট থেকে শুরু করে হোটেলপাড়ার উচ্ছেদ হওয়া ভাসমান নারীদের কাছেও পৌঁছাতে চায় এই সংগঠনগুলো। প্রান্তিক মায়েদের সন্তানদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ‘আস্থা শেল্টার হোম’, যাতে সামাজিক কুসংস্কারের মুখে তাদের জীবন থমকে না যায়। অন্ধকার গলি পেরিয়ে এই নারীদের আলোর ঠিকানায় ফেরার পথটি বন্ধুর হলেও, তাঁরা এগিয়ে চলেছেন এক নতুন সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে। SHARES মতামত বিষয়: কল্যাণময়ী নারী সংঘগিভ বাংলাদেশপুনর্বাসনভাসমান যৌনকর্মীমুগদারিনা আক্তারসমাজসেবা