রায়পুরে মা ও ৩ বোন হত্যার চার মাস: কারণ এখনও অজানা, বিচার চান সিফাত

প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০২৬

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীপারের একটি ভাড়া বাসায় গত ২৫ জুন ঘটে যায় নৃশংস এক হত্যাকাণ্ড। সেদিন বাড়িতে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ওরফে ইকরা (১৭) ও ১০ বছর বয়সী ফাতেমা আক্তার ওরফে সিফাকে। ঘটনার পর চার মাস কেটে গেলেও কেন এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো, সেই রহস্যের জট আজ পর্যন্ত খোলেনি। চার মাসের মাথায়ও নেপথ্য কারণ জানতে না পেরে চরম হতাশা ও কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন পরিবারটির বেঁচে থাকা একমাত্র সদস্য, নিহত শাহিনুরের ১৮ বছর বয়সী ছেলে জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত।

স্বজনদের হারানোর পর থেকে জুনায়েদ পাশের একটি বাসায় ভাড়া থাকেন এবং এলাকার একটি রড-সিমেন্টের দোকানে চাকরি করছেন। দিনের বেলা দোকানে কাজ শেষে রাতে বাসায় ফিরলেই ঘাতকের হাতে প্রাণ হারানো মা ও তিন বোনের স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। গত শনিবার কর্মস্থলের পাশের একটি কক্ষে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জুনায়েদ বলেন, বিচার তো অনেক দূরের কথা, চার মাস পার হয়ে গেল কিন্তু আমার মা ও তিন বোনকে কেন হত্যা করা হলো, এখনো সেই কারণই জানতে পারলাম না।

নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, মা ও বোনদের জন্য প্রতিটি দিন অসহনীয় কষ্টে কাটে। রাতে বাসায় ফিরলে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে, বিছানায় ছটফট করলেও ঘুম আসে না। প্রতিদিনই মনে হয় তারা বুঝি ঘরেই আছে, কিন্তু পরক্ষণেই ভুল ভেঙে যায়। জুনায়েদের আকুল দাবি, পুলিশ যেন সব দিক গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে। অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে নাকি অন্য কেউ এর পেছনে যুক্ত ছিল, তা উদ্‌ঘাটন করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও প্রকৃত সত্য প্রকাশের জোর দাবি জানান তিনি।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই পালানোর সময় অভিযুক্ত যুবক অন্তর মজুমদারকে (২৮) আটক করে গণপিটুনি দেয় স্থানীয় বাসিন্দারা। পরবর্তীতে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বাসিন্দা অন্তর। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রায়পুর থানায় জুনায়েদ একটি হত্যা মামলা করেন। অন্যদিকে অন্তরের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি পৃথক হত্যা মামলা করে। তবে চার মাসেও দুটি মামলার কোনটিরই তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। এর আগে ঘটনার পরদিন বিকেলে ধানহাটা এলাকায় নিহতদের জানাজা শেষে কুমিল্লার হোমনায় গ্রামের বাড়িতে তাঁদের দাফন সম্পন্ন হয়।

মামলার তদন্ত অগ্রগতি সম্পর্কে পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে প্রেমঘটিত বিরোধ, কোনো লেনদেন, স্বর্ণালংকার লুট কিংবা ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা ছিল কি না—সবকটি বিষয়ই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এর কোনোটির পক্ষেই এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। ঘটনার দিন ভাড়া বাসাটিতে তল্লাশি চালিয়ে নগদ টাকা ও কিছু স্বর্ণালংকার অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ, যার কারণে এটি কেবল লুটপাটের উদ্দেশ্যে ঘটেছে বলে মনে করছেন না তদন্তকারীরা। তবে ঘর থেকে পরিবারের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন নিখোঁজ ছিল, যা পরবর্তীতে অন্তরকে গণপিটুনি দেওয়ার স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। অন্তর নিজেই ফোন দুটি নিয়ে বেরিয়েছিলেন কি না এবং নিহতদের কারও সঙ্গে তাঁর পূর্বে যোগাযোগের প্রমাণ আছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। তবে পুলিশের তথ্যমতে, তাঁদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দুটি মামলারই তদন্ত কর্মকর্তা রায়পুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মান্নান জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে আলামত, ফরেনসিক রিপোর্ট, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে এগোচ্ছে তদন্ত। রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়াও বিষয়টিকে বহুল আলোচিত উল্লেখ করে বলেন, কোনো তাড়াহুড়া না করে প্রতিটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং মূল রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।