উচ্চশিক্ষায় প্রশাসনিক পরিবর্তন: নতুন সরকারের ছয় মাসের পর্যবেক্ষণ ও সংশয়

প্রকাশিত: ৬:৩০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০২৬

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই লক্ষ্যে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, কারিকুলাম সংস্কার, শিক্ষক–সংকট নিরসন এবং আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। যদিও এসব কর্মসূচির একটি বড় অংশ এখনো পরিকল্পনা বা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে ইতিমধ্যে উচ্চশিক্ষা খাতে বেশ কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে, যা নতুন প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি করেছে।

দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যদের অব্যাহতি দিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একাডেমিক যোগ্যতা বা প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে বিশেষ দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনায় আনা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন, যাঁরা অতীতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে সাময়িকভাবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ছিলেন এবং যাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এমনকি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে ভাষা-সাহিত্য বা বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষকদের উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া প্রচলিত নিয়ম উপেক্ষা করে উপাচার্যদের চার বছরের পূর্ণ মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা ১৯৭৩ সালের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে হওয়ার কথা ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেও (ইউজিসি) বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে মেডিকেল ব্যাকগ্রাউন্ডের অধ্যাপকের অন্তর্ভুক্তি এবং সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত তরুণ শিক্ষকদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা নজিরবিহীন। ১৯৭৩ সালের ইউজিসি অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কমিশনের সদস্য হওয়ার কথা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বা দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের। অথচ এবার অভিজ্ঞ ও বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত তরুণদের নিয়োগ দেওয়ায় এর নীতিগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এছাড়া একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারজনকে নিয়োগ না দিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিলে আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যেত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের সিন্ডিকেট সদস্য করা বা উদ্বোধনী ক্লাস নেওয়ার মতো প্রবণতা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতির উন্মুক্ত মঞ্চে পরিণত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রাধান্য পেলে আধুনিক ও উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। ছাত্র-জনতার ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই সুযোগ হেলায় হারানোর কোনো অবকাশ নেই।