নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে বড় পরিবর্তন, আসছে ৭টি পৃথক এসআরও

প্রকাশিত: ৪:০১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬

ঢাকা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৬ পিএম | ‘নবম জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬’ বাস্তবায়নে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মূল বেতন কাঠামো কার্যকরের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণির সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পৃথক সাতটি বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ বা এসআরও (SRO) জারি করা হবে। একই সঙ্গে ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ (iBAS++)-এর মাধ্যমে অনলাইনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রজ্ঞাপন জারির পর এসব কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রজ্ঞাপনের খসড়াটি ইতোমধ্যে আইনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভেটিং প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এতে বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক সাতটি এসআরও থাকবে। এই আদেশগুলোর মাধ্যমে বেসামরিক প্রশাসন, police, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগ—এই সাতটি ক্ষেত্রের বেতন-ভাতা ও সংশ্লিষ্ট বিধান আলাদাভাবে কার্যকর করার বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন নির্ধারণ করা হবে অনলাইনে আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থার মাধ্যমে। এই পদ্ধতিতে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অনলাইনে আইবাস প্লাসে প্রবেশ করে নিজের চাকরি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে পদ, গ্রেড, মূল বেতন, চাকরিতে যোগদানের তথ্য, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট), পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এসব তথ্য পূরণ ও যাচাই হয়ে গেলে সফটওয়্যারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন পে-স্কেলের কাঠামো অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর মূল বেতন ও প্রযোজ্য ভাতা কত হবে তা নির্ধারণ করে দেবে।

এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রজ্ঞাপন জারির পরই বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন কাঠামোর প্রয়োগে কারিগরি ও প্রশাসনিক যেসব পার্থক্য রয়েছে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে পৃথক এসআরও প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রজ্ঞাপন জারির পর সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে বাস্তবায়নের কাজ আরও স্পষ্ট হবে। তিনি আরও বলেন, সাতটি পৃথক এসআরও-এর মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো প্রয়োগের বিষয়গুলো নির্ধারণের পাশাপাশি আইবাস প্লাস প্লাসে তথ্য হালনাগাদ এবং বেতন নির্ধারণের কারিগরি প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নবম পে-স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়। এতে ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন এই কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

সাতটি পৃথক এসআরও-এর বিস্তারিত বিন্যাসে দেখা যায়—বেসামরিক প্রশাসনের সাধারণ বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি, পুলিশ সদস্যদের বেতন ও আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে পুলিশ বিভাগের জন্য একটি, বিজিবি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথক বিধান রেখে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের জন্য একটি, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একটি, সরকারের বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের একটি, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের একটি এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের কর্মকর্তা ও বিচারকদের জন্য জুডিশিয়াল বা বিচার বিভাগের জন্য একটি এসআরও জারি করা হবে। অর্থাৎ, একটি সাধারণ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মূল কাঠামো কার্যকর হলেও বিস্তারিত প্রয়োগবিধি পৃথক আদেশের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হবে।

আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থায় বেতন নির্ধারণের ফলে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পেনশন, বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে এই সফটওয়্যারটি অনলাইন বেতন বিল, জিপিএফ, ঋণ ও আয়কর-সংক্রান্ত হিসাব তৈরি এবং ইএফটির মাধ্যমে বেতন-পেনশন দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। নবম পে-স্কেলের নতুন গ্রেড, মূল বেতন, ভাতা, পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্টের আলাদা বিধান থাকায় বিদ্যমান সফটওয়্যারটিকে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কাজ চলছে। অর্থ বিভাগের লক্ষ্য হচ্ছে কাগজে-কলমে বেতন নির্ধারণের সনাতন পদ্ধতির বদলে তথ্যভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বেতন পুনর্নির্ধারণ করা। এতে কর্মচারীদের হিসাবরক্ষণ অফিসে বারবার যাওয়ার প্রয়োজন কমবে এবং ভুল হিসাব, দ্বৈত সুবিধা বা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বেতন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। সরকারের পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা থাকলে একবারে নতুন কাঠামো বাস্তবায়ন করা যেত, তবে একাধিক ধাপে বাস্তবায়ন করাও বাস্তবসম্মত। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।