সিন্ডিকেট ও অবৈধ মজুতদারি নিয়ে ইসলামের কঠোর হুঁশিয়ারি প্রকাশিত: ৯:৩৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২৬ বর্তমানে বাজারে সিন্ডিকেটের থাবায় সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে চরম হিমশিম খাচ্ছে। অনেককেই লোকলজ্জা ভুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে কম মূল্যে পণ্য কিনতে দেখা যাচ্ছে। সরকারিভাবে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। পরবর্তীতে বাজারে ঘাটতি দেখা দিলে তারা আকাশচুম্বী দামে পণ্য বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লোটে। এই অমানবিক ও নৈতিকতাহীন কর্মকাণ্ডকে ইসলামে সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। সিন্ডিকেটের আরবি প্রতিশব্দ হলো 'আল-ইহতিকার', যার আভিধানিক অর্থ গুদামজাত বা মজুত করা। প্রথম আরবি অভিধান রচয়িতা খলিল ইবনে আহমদ আল-ফারাহিদি (রহ.)-এর মতে, মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যজাত অন্যান্য জিনিস জমা করে রাখাকেই ইহতিকার বলা হয় এবং যে ব্যক্তি এটি করে সে-ই মজুতদার (আল-আইন : ৩/৬২)। অন্যদিকে, হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এ বিষয়ে বলেন, নিজের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও এবং জনগণের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য বিক্রি থেকে বিরত থাকাই হলো সিন্ডিকেট বা মজুতদারি (ফাতহুল বারি ফি শরহিল বুখারি : ৪/৪৪০)। ইমাম আওজায়ি (রহ.)-এর মতে, বাজারে পণ্য সরবরাহের পথে যে বাধা সৃষ্টি করে এবং মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য মজুত করার উদ্দেশ্যে ক্রয় করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে, সে-ই প্রকৃত মজুতদার (নাইলুল আওতার : ৩/৬০৫)। সাধারণ মানুষের ক্ষতি করে অতি মুনাফার উদ্দেশ্যে খাদ্যসামগ্রী মজুত করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, 'শুধু পাপী ব্যক্তিই মজুতদারি বা সিন্ডিকেট করে থাকে।' (মুসলিম : ১৬০৫)। ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহের কিতাব অনুযায়ী, কম মূল্যে খাদ্য কিনে তা গুদামজাত করা এবং অত্যধিক প্রয়োজনের সময় চড়া দামে বিক্রি করা সমস্ত ইসলামি আইনজ্ঞের মতে হারাম (আল-ফিকহুল মুয়াসসার : ৬/৪৫)। মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য অপরিহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাদ্যশস্য ও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুত করা নিষিদ্ধ (আল-জামে লি উলুমি ইমাম আহমদ : ৯/১৫৯)। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, যেসব ক্ষেত্রে মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত, সেখানে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হারাম। সব ধরনের মজুতদারি কিন্তু হারাম নয়। তবে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে ইসলামে নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন—কম দামে পণ্য কিনে বেশি লাভের আশায় এমনভাবে গুদামজাত করা যাতে বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, চরম সংকটের সৃষ্টি করে এমন পরিমাণে পণ্য আটকে রাখা, সাধারণ মানুষের সংকটের সময়ে যেকোনো পরিমাণ খাদ্য মজুত করা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে পণ্য ধরে রাখা। এই সিন্ডিকেট কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গণপরিবহন যেমন—গাড়ি, লঞ্চ বা ট্রেনের টিকিটের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। টিকিট থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করাও এক ধরনের মহামারি রূপ নিয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পাইকারি, মধ্যস্থতাকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও সাধারণ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আহজাবে (আয়াত : ৫৮) বলেছেন, 'যেসব লোক বিনা দোষে মোমিন পুরুষ ও নারীকে কষ্ট দেয়, তারা অতি বড় একটা মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট গোনাহের বোঝা নিজেদের মাথায় তুলে নেয়।' অবৈধ মজুতদারির জন্য ইসলামে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়াবহ শাস্তির কথা বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীদের অভিশপ্ত ঘোষণা করে বলেছেন, 'আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত আর মজুদদাররা লানতপ্রাপ্ত, অভিশপ্ত।' (মুসনাদে দারেমি : ২৫৮৬)। এছাড়া তিনি আরও সতর্ক করে বলেছেন, 'যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুত করে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত করবেন অথবা দেউলিয়া বানাবেন।' (আল-মুন্তাখাবুল আদাবি : ১৭)। রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক চিহ্নিত এই পাপিষ্ঠদের নিয়ে তিনি আরও বলেছেন, 'পাপিষ্ঠ ছাড়া কেউ মজুতদার হতে পারে না।' (মুসলিম : ১২২৮)। মানুষের এই কষ্টের ফরিয়াদ সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্ভিক্ষসহ নানা আল্লাহর আজাব ডেকে আনতে পারে। তাই ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ নিশ্চিত করতে এই ঘৃণ্য সিন্ডিকেট ও মজুতদারি প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি। যেসব ক্ষেত্রে মজুতদারি হারাম : সকল মজুতদারি হারাম নয়। এজন্য জানতে হবে, সমাজে প্রচলিত কোন ধরনের মজুতদারি হারাম। কিছু হারাম মজুতদারির ধরন তুলে ধরা হলো— ১. স্বল্পমূল্য চলাকালে খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করে বেশি লাভের আশায় এমনভাবে গুদামজাত করা, যার ফলে বাজারে তার প্রতিক্রিয়া পড়ে। ২. কোনো দ্রব্য এমন পরিমাণে গুদামজাত করা, যে কারণে ক্ SHARES অন্যান্য বিষয়: ইসলামইসলামি বিধানবাজার-দরভোক্তা-অধিকারমজুতদারিসিন্ডিকেট