মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় তেলের দাম ১৫০ ডলারের আশঙ্কায় বিশ্ববাজার

প্রকাশিত: 6:43 PM, July 24, 2026

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বা পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর গত কয়েক মাসে বিশ্ববাজার বিকল্প সরবরাহ পথ ব্যবহার করে বড় ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক সীমিত ছিল। যুদ্ধের সময় দাম বাড়লেও তা ২০২২ সালের ১২৮ ডলার বা ২০০৮ সালের ১৪৬ ডলারের রেকর্ড স্পর্শ করেনি। তবে এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং সেই বিকল্প ব্যবস্থাগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ছে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট জানিয়েছেন, সংঘাত এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের ওপরে এবং ডিজেলের দাম ৫ দশমিক ২০ ডলার ছাড়িয়েছে। বন্ডবাজারের ইঙ্গিত অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

ইরানের হামলার কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের পথে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, কিন্তু ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর অবরোধের কারণে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এতে সৌদি আরবের প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও সুয়েজ খাল দিয়ে বিকল্প পথে তেল পাঠানোর সুযোগ রয়েছে, তবে বড় আকারের পূর্ণ বোঝাই তেলবাহী জাহাজ সেখানে চলাচল করতে পারে না। ফলে চার সপ্তাহের যাত্রা আট সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।

লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশন (এলএমএ) সতর্ক করেছে যে, ইরান প্রতি ব্যারেল তেলের ওপর ১ থেকে ২ ডলার টোল আরোপের যে পরিকল্পনা করেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট জাহাজের পুরো বীমা বাতিল হয়ে যেতে পারে। আবার টোল না দিলে ইরান হামলার হুমকি দিচ্ছে, ফলে জাহাজগুলো কোনো নিরাপদ বিকল্প পাচ্ছে না।

তেলের এই সংকট এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি শোধনাগার এবং কৃষ্ণ সাগরের ক্যাসপিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের আগে রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করত, যা বৈশ্বিক সরবরাহের ১২ শতাংশ। কৃষ্ণ সাগরের পাইপলাইনে বিঘ্ন ঘটায় প্রতিদিন আরও প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজার থেকে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো বৈশ্বিক তেলের মজুত দ্রুত কমে যাওয়া। গত পাঁচ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মজুত প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলভাণ্ডার ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং গত বসন্তের পর থেকে সেখান থেকে ১১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়েছে। চীন যুদ্ধ শুরুর আগে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করলেও আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে দেশটিকে আবারও বড় পরিসরে আমদানি বাড়াতে হবে। গোল্ডম্যান স্যাকসের তেলবিষয়ক গবেষণা বিভাগের প্রধান ড্যান স্ট্রুইভেনের মতে, অক্টোবর নাগাদ অপরিশোধিত তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, আর হেলিমা ক্রফটের আশঙ্কা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে তা ১৫০ ডলার অতিক্রম করা অস্বাভাবিক নয়।