দীর্ঘ শিক্ষকতা শেষে যুক্তরাজ্যের ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর নতুন অভিজ্ঞতা প্রকাশিত: ৩:২২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬ বাংলাদেশে দেড় দশকেরও বেশি সময় শিক্ষকতা, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের সহায়তার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর এবার আমি নিজেই আবার শিক্ষার্থীর আসনে। তবে এবারের শ্রেণিকক্ষটি বাংলাদেশের বাইরে, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের (ইউডব্লিউএস) লন্ডন ক্যাম্পাসে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি শিক্ষাবর্ষে মাস্টার অব এডুকেশন ইন এডুকেশনাল স্টাডিজ নিয়ে পড়তে গিয়ে আমার কাছে সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে নিজেকে নতুন করে শিক্ষার্থী হিসেবে আবিষ্কার করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ২০১১ সালে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগদানের পর থেকে আমি মাইকেল মধুসরন কলেজ, ব্রজলাল কলেজ ও খুলনা সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছি। পাশাপাশি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন পাঠদান এবং সরকারের পাঁচটি শিক্ষা প্রজেক্টে মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে কাজ করেছি। বিদেশযাত্রার আগে সর্বশেষ দায়িত্ব পালন করেছি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে। যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বুঝলাম, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর নিজের শেখার দায়িত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশে শিক্ষকতা করার সময় শিক্ষার্থীদের বিষয়বস্তু বোঝানো ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করাই ছিল মূল কাজ। কিন্তু এখানে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক একটি তত্ত্ব বা বিষয় ব্যাখ্যা করার পর শিক্ষার্থীর নিজের অনুসন্ধান শুরু হয়। শুধু সঠিক উত্তর জানা যথেষ্ট নয়, বরং উত্তরের পেছনের প্রমাণ ও ভিন্নমতের সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা জরুরি। বাংলাদেশে শিক্ষককে সাধারণত জ্ঞানের প্রধান উৎস হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এখানে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে। শিক্ষকের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে শিক্ষার্থী যুক্তি দিয়ে তা বলতে পারে, যা শেখারই একটি অংশ। আমি একবার ঈদের দিনে ক্লাস করার বিষয়ে ইনক্লুসিভ এডুকেশনের ঘাটতি নিয়ে শিক্ষককে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি আমার প্রশ্নকে স্বাগত জানিয়ে হাসিমুখে যুক্তিপূর্ণ উত্তর দেন, যা আমাকে শিখিয়েছে শিক্ষকের কর্তৃত্ব প্রশ্ন বন্ধ করার মধ্যে নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশ তৈরির মধ্যে। এখানকার মূল্যায়নপদ্ধতিও ভিন্ন। একটি লিখিত কাজে শুধু তথ্য দেওয়া নয়, বরং সুসংগঠিত একাডেমিক যুক্তি তৈরি করতে হয়। এছাড়া স্বনির্ভর অধ্যয়ন, পোর্টফোলিও, প্রতিফলনমূলক দিনলিপি ও উপস্থাপনার মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীকে বিশ্লেষণী চিন্তা করতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা শ্রেণিকক্ষের আলোচনাকে সমৃদ্ধ করে। অবশ্যই কোনো শিক্ষাব্যবস্থাই নিখুঁত নয়। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সীমিত সম্পদের মধ্যে টিকে থাকার সক্ষমতা ও কঠোর পরিশ্রমের শক্তি রয়েছে। আমাদের প্রয়োজন নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যকর পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করা। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পর আবার শিক্ষার্থী হওয়া আমার জন্য আয়নার সামনে দাঁড়ানোর মতো। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, একজন ভালো শিক্ষককে সারা জীবন শিক্ষার্থী হয়ে থাকতে হয়। কারণ, শিক্ষা কোনো একমুখী প্রক্রিয়া নয়; শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীকে শেখান, শিক্ষার্থীর প্রশ্নও শিক্ষককে নতুন করে শিখতে সাহায্য করে। কিন্তু এই পরিবর্তন আমাকে শিক্ষকতা থেকে দূরে নেয়নি; বরং শিক্ষকতার অর্থকে আরও বিস্তৃত করেছে। আবার যখন কোনো শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়াব, তখন শুধু তাকে কী শেখাব—সেটিই ভাবব না; বরং ভাবব, ‘আমি তার কাছ থেকেও কী শিখতে পারি!’ হয়তো একজন শিক্ষককে আজীবন শিক্ষার্থী করে রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, ২৭০৫ SHARES শিক্ষা বিষয়: অভিজ্ঞতাউচ্চশিক্ষাছাত্রজীবনযুক্তরাজ্যশিক্ষকতাশিক্ষাব্যবস্থা