গার্মেন্ট খাতের অস্থিরতায় ডিসেম্বরকে লক্ষ্য করে ষড়যন্ত্রের তথ্য পেল গোয়েন্দারা

প্রকাশিত: ১২:৩৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২৬

তৈরি পোশাক খাতে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া শ্রমিক অসন্তোষ কেবল দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর নেপথ্যে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সরাসরি ইন্ধন ও ষড়যন্ত্রের সুনির্দিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটন করেছে গোয়েন্দা সংস্থা (প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১২ পিএম)। সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে ডিসেম্বর মাসকে লক্ষ্য করে শিল্পাঞ্চল উত্তপ্ত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। অসাধু কিছু চক্র শ্রমিকদের উসকে দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, কারখানা ভাঙচুর এবং পোশাক খাতকে অচল করার পেছনে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বার্তা ছড়ানো এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে নেপথ্য অর্থায়নের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

দেশের শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং মূল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এসংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া হয়েছে। শীর্ষ মহলের থেকে সবুজ সংকেত পেলেই জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতের এই অস্থিরতার নেপথ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পতিত আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী এবং কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতা। সম্প্রতি রোববার মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় যে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল, সেখানে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়েছে। ওই সব ঘটনার প্রেক্ষাপট ও জড়িতদের বিস্তারিত পরিচয়সংবলিত প্রতিবেদন এখন সরকারের সর্বোচ্চ মহলের হাতে রয়েছে। ইতোমধ্যে জড়িতদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি বজায় রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে, গার্মেন্টস আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী। সাধারণ শ্রমিকদের ভিড়ে মিশে তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এর ফলে মিরপুর, গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পকারখানা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মেট্রোরেল স্টেশন, ব্যাংক ও স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলো নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে। গুজব ছড়িয়ে বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটানোর আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে শিল্প এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার জানান, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন স্বাভাবিক একটি বিষয়। তবে এবার সাধারণ শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের স্পষ্ট চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে পতিত সরকারকে ডিসেম্বর মাস ঘিরে উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে শোনা গেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় তাদের কর্মীরা শ্রমঘন এলাকায় নানামুখী প্রচারণা চালাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারখানায় ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার যেসব ভিডিও দেখা যাচ্ছে, তাতে কোনো সাধারণ শ্রমিক জড়িত থাকতে পারেন না বলে তিনি মন্তব্য করেন। মালিক-শ্রমিক সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মালিকদের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণ করা, তা না হলে গণ-অভ্যুত্থানবিরোধীরা এই সুযোগ নেবে।

একই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, এই আন্দোলনকে কোনোভাবেই সুস্থ আন্দোলন বলা যায় না। সাধারণ শ্রমিকরা চরম বিপদে পড়েছেন। অনেকে কাজে যোগ দিতে চাইলেও কারখানায় ঢিল ছুড়ে ও পথরোধ করে তাদের আন্দোলনে নামতে বাধ্য করা হচ্ছে, এমনকি কেউ না যেতে চাইলে চড়াও হওয়া হচ্ছে। তিনি যোগ করেন, গঠনমূলক আন্দোলনের মাধ্যমে মজুরি বৃদ্ধির দাবি তুললে কেউ বাধা দেবে না, তবে শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে দিনশেষে তার চূড়ান্ত ক্ষতি শ্রমিকদেরই বহন করতে হবে।

বাংলাদেশ এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করায় এই মুহূর্তে নতুন করে আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। মূলত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড পোশাকশিল্পকে বেছে নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে, কারণ এই খাতের সহজ-সরল শ্রমিকদের সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। তিনি বলেন, শিল্পের সঙ্গে জড়িত কোনো সাধারণ শ্রমিক নিজের কারখানায় ভাঙচুর চালাতে পারেন না; এর নেপথ্যে থাকা অপশক্তিকে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় না আনলে শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।