এইচএসসির সম্পূরক পরীক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সময়সূচিতে সমন্বয়হীনতার আশঙ্কা

প্রকাশিত: ৪:৪৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০২৬

উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পথ সহজ করতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের জন্য আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে সম্পূরক পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা বিভাগ। তবে শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম বর্ষে ভর্তির আবেদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই পরীক্ষার সময়ের সমন্বয় না থাকায় উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পরীক্ষা আয়োজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি সময়সূচির মধ্যে পূর্ব সমন্বয়ের অভাব শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

শিক্ষা বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, সম্পূরক পরীক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির তারিখ মেলানো নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ বছর সম্পূরক পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। তবে আগামী বছর থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে এবং অসামঞ্জস্যতাগুলো কাটানো যাবে বলে আশা করছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা।

ইতিমধ্যে দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ভর্তি কার্যক্রমের তারিখ ঘোষণা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তির অনলাইন আবেদন কার্যক্রম আগামী ১১ নভেম্বর শুরু হয়ে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। এখানে আইবিএ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৫ ডিসেম্বর, বিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষা ১২ ডিসেম্বর, কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষা ১৯ ডিসেম্বর, চারুকলা ইউনিটের সাধারণ জ্ঞান ও অঙ্কন পরীক্ষা ২২ ডিসেম্বর এবং ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২৬ ডিসেম্বর। এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাথমিক আবেদন নেওয়া হবে ১২ নভেম্বর থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত, যেখানে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ৮, ৯ ও ১৬ জানুয়ারি (যথাক্রমে ‘বি’, ‘সি’ ও ‘এ’ ইউনিট)।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ভর্তি আবেদন চলবে ১৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষা আগামী ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা কমিটির প্রধান অধ্যাপক কামরুল হাসান জানিয়েছেন, আগামী ২০ তারিখের পর একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় অনুমোদনের মাধ্যমে বুয়েটের আবেদন গ্রহণের তারিখ চূড়ান্ত করা হবে। তবে বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে সম্পূরক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা আবেদনের যোগ্য হবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বুয়েটে অত্যন্ত সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় বসতে পারেন উল্লেখ করে অধ্যাপক কামরুল হাসান প্রশ্ন রাখেন, সম্পূরক পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীদের সেখানে আবেদনের সুযোগ দিয়ে আদৌ কোনো লাভ হবে কি না।

সম্পূরক পরীক্ষার উদ্যোগকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাস করার একটি নতুন পথ উন্মোচিত হয়েছে। তবে প্রতিযোগিতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি আসনের বিপরীতে অতীতে ৮০ জন এবং বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ জন পরীক্ষার্থী লড়াই করেন, যার মধ্যে ৯৫ থেকে ৯৬ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাসের নম্বর পেতে ব্যর্থ হন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে সম্পূরক পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় কতটুকু সুবিধা করতে পারবেন, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির পাশাপাশি ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণ বা পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ৯ নভেম্বর সম্পূরক পরীক্ষার চলতি ফরম পূরণের সময় শেষ হতে যাচ্ছে, এবং ফি জমা দেওয়ার শেষ সময় ১০ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। অথচ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশ করা হবে ২৩ নভেম্বর। চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন অভিভাবক নিজের প্রতিবেশীর সন্তানদের উদাহরণ টেনে নাম প্রকাশ না করার শর্তে উদ্বেগ জানান যে, যেসব শিক্ষার্থী তিন বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন, তাঁরা যদি ফলে পাস করে দুই বা এক বিষয়ে অকৃতকার্যের তালিকায় আসেন, তবে ফরম পূরণের মেয়াদ আগেই শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁরা সম্পূরক পরীক্ষা দেওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানূ জানান, শিক্ষার্থীদের সার্বিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা হবে।

চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন, যেখানে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। চূড়ান্ত ফলাফলে মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন পরীক্ষার্থী এক ও দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। এর মধ্যে এক বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ এবং দুই বিষয়ে অকৃতকার্য ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন। মূলত চতুর্থ বিষয় বাদে সর্বোচ্চ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া এসব নিয়মিত ও অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য ১ ডিসেম্বর সম্পূরক পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

সম্পূরক পরীক্ষার ফি হিসেবে তত্ত্বীয় প্রতি পত্র বা বিষয়ের জন্য ১২৫ টাকা, ব্যবহারিক প্রতি পত্রের জন্য ২৫ টাকা এবং পরীক্ষাকেন্দ্র ফি ৪ ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫ নভেম্বর ফরম পূরণ শুরুর দিনেই আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি নির্দেশ দিয়েছে যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ফি আদায় করলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত পুনরায় পরীক্ষার এই সুযোগ নিয়ে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, সরকারের সদিচ্ছা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেশনজটের কথা মাথায় রেখেই ফল প্রকাশের এক মাসের মাথায় এই পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি জানান, দেশের শীর্ষ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর সম্পূরক পরীক্ষার ফল আমলে না নিলেও অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে আসন খালি থাকবে, যা শিক্ষার্থীরা কাজে লাগাতে পারবেন।

ইউজিসির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্য মোট আসন রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ৯২ হাজার। এর মধ্যে সরকারি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১০ লাখের বেশি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৪ লাখের বেশি আসন বিদ্যমান। এ বছর উত্তীর্ণ ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থীর সবাই ভর্তি হলেও ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি আসন ফাঁকা থাকার কথা। এই বিপুল আসন থাকা সত্ত্বেও সমন্বিত উদ্যোগ ও সঠিক সময়সূচির অভাবে পুনর্নিরীক্ষণ বা সম্পূরক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার মূল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হলে সরকারের ভালো উদ্যোগের ইতিবাচক সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদেরা।

এ ছাড়া পরীক্ষাকেন্দ্র ফি ৪৫০ টাকা।এদিকে পরীক্ষার ফরম পূরণের নামে কোনো পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করা যাবে না বলে নির্দেশনা দিয়েছে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।