সরকারি ও কাস্টমস সূত্রের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এলাচসহ বিভিন্ন মসলার আমদানি কিছুটা কমলেও বাজারে কোনো দৃশ্যমান ঘাটতি নেই। বরং খুচরা ও পাইকারি বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকা সত্ত্বেও দাম ক্রমাগত বাড়ছে, যা বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এলাচ আমদানি আগের বছরের তুলনায় কমে গেলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব সরাসরি ঘাটতি হিসেবে দেখা যায়নি। বরং আমদানির প্রকৃত ব্যয় ও খুচরা বাজারমূল্যের মধ্যে বিপুল ব্যবধান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেখানে প্রতি কেজি এলাচ আমদানিতে শুল্কসহ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৪৬৬ টাকা, সেখানে বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৬০০ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকায়।
একইভাবে লবঙ্গ, জিরা ও দারুচিনির ক্ষেত্রেও আমদানি ব্যয় ও বাজারমূল্যের মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক বাজার প্রক্রিয়ার ফল নয়, বরং একটি সংগঠিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ীর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই স্থানীয়ভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে আমদানির প্রকৃত মূল্য গোপন রাখা হচ্ছে এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে লেনদেন করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, “কাগজে-কলমে আমদানির দাম কম দেখানো হলেও বাস্তবে বড় অঙ্কের টাকা বাইরে থেকে লেনদেন হয়। এতে কর ফাঁকি যেমন হচ্ছে, তেমনি বাজারেও একটি কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।”
ভোক্তাদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের একজন ক্রেতা বলেন, “বাজারে পণ্য আছে, তবুও দাম প্রতিদিন বাড়ছে। সাধারণ মানুষ এখন মসলা কেনাও কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।”
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মসলার বাজারের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান ও অনানুষ্ঠানিক আমদানি চক্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এতে সরকার যেমন বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি বৈধ ব্যবসায়ীরাও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের মসলার চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বৈধ আমদানির বাইরে থেকে পূরণ হচ্ছে, যা বাজারে অস্বচ্ছতা আরও বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কঠোর নজরদারি, এলসি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত চোরাচালান রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। না হলে মসলার বাজারের এই অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে।