বর্তমান ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য ধাপে ধাপে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ কম ইউনিট ব্যবহারকারীরা তুলনামূলক কম দরে বিদ্যুৎ পান এবং ব্যবহার যত বাড়ে ধাপে ধাপে দামও বাড়ে। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে এই স্ল্যাব কাঠামো পরিবর্তন করে ৭৫ ইউনিটের পর থেকে পুরো ব্যবহারের ওপর উচ্চ দরের প্রভাব আরোপ করার কথা ভাবা হচ্ছে। এতে মধ্যম আয়ের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ বিল হিসাবের স্বাভাবিক কাঠামো ভেঙে যেতে পারে।
এই পরিবর্তন কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর, যারা সাধারণত মাসে ১০০ থেকে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। দৈনন্দিন জীবনে লাইট, ফ্যান, ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করার কারণে এই শ্রেণির জন্য বিদ্যুৎ বিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসিক ব্যয়। স্ল্যাব পুনর্বিন্যাস হলে একই ব্যবহারেও বিল কয়েকশ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পিডিবির যুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের আর্থিক ঘাটতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামাল দিতেই এই ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সংস্থাটির মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
পিডিবি আরও প্রস্তাব করেছে বছরে দুইবার বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানি মূল্যের সঙ্গে স্থানীয় মূল্য কাঠামো সামঞ্জস্য রাখা যায়। একই সঙ্গে মাল্টিইয়ার ট্যারিফ পদ্ধতি চালুর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের দাম আগেই নির্ধারণ করা যায়।
তবে এই প্রস্তাব ঘিরে ভোক্তা পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এই উদ্যোগের সমালোচনা করে বলেছে, বিদ্যুৎ খাতে অপচয়, অকার্যকর চুক্তি এবং উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের দায় সাধারণ গ্রাহকের ওপর চাপানো উচিত নয়। তাদের মতে, আগে খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, স্ল্যাব পরিবর্তনের মাধ্যমে সাময়িক রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যয় বাড়লে তা সরাসরি জীবনযাত্রার মানে প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে এই প্রস্তাবটি পর্যালোচনার জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ কমিশন –এর কাছে রয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন, জনশুনানি এবং ভোক্তা মতামত বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে স্ল্যাব পুনর্বিন্যাসের এই উদ্যোগ এখন শুধু একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।