চট্টগ্রামে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে হাম সংক্রমণ। একসময় শিশুদের রোগ হিসেবে পরিচিত এই ভাইরাস এখন বড়দের শরীরেও ভয়ংকরভাবে আঘাত হানছে। জ্বর, র্যাশ, তীব্র দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও তরুণীরা। চিকিৎসকরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতি ও সচেতনতার অভাবের কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ইনফেকশাস ব্লকে চিকিৎসাধীন ১৬ বছর বয়সী কিশোরী জান্নাতুল। পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রথমে সাধারণ ভাইরাল জ্বর মনে হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তার অবস্থার অবনতি ঘটে। শরীরে র্যাশ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি শুরু হয় তীব্র শ্বাসকষ্ট। পরে দ্রুত তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জান্নাতুলের বড় বোন আয়েশা আক্তার বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি বড়দেরও হাম হতে পারে। ওর শ্বাস নিতে এত কষ্ট হচ্ছিল যে খুব ভয় পেয়ে যাই। পরে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসি।”
একই ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা আরও কয়েকজন রোগীর পরিবারও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। চাক্তাই ফিশারিঘাট এলাকার কুলসুমা বেগম ছয় দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার স্বামী আলী আফসার বলেন, “শুরুতে আমরা বুঝতেই পারিনি এটা হাম। সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করেছি। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে আনতে হয়েছে।”
অন্যদিকে অর্পিতা দাসের পরিবারও প্রথমে রোগটি শনাক্ত করতে পারেনি। তীব্র জ্বর ও দুর্বলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি হাম আক্রান্ত।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি সময়ে অন্তত ৩৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী হামের চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন পাঁচজন নারী রোগী। একই সময়ে শিশু ওয়ার্ডেও চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৪ জন শিশু।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ১৪ বছরের বেশি বয়সী রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ইনফেকশাস ব্লকে। সেখানে ৪০ বছর বয়সী রোগীও চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক হয়তো শৈশবে পূর্ণ টিকা নেননি অথবা সময়ের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ভাইরাসটি সহজেই সংক্রমণ ঘটাচ্ছে এবং জটিল আকার নিচ্ছে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা ও তীব্র দুর্বলতার মতো উপসর্গ বেশি দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, “আগে বড়দের মধ্যে হাম খুব একটা দেখা যেত না। এখন অনেকেই জানেন না তারা পূর্ণ টিকা নিয়েছিলেন কি না। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।”
আরেক চিকিৎসক রায়হান সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, “এখনও অনেকের ধারণা হাম শুধু শিশুদের রোগ। এই ভুল ধারণার কারণে অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসছেন, যা পরে জটিলতা তৈরি করছে।”
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। তাই জ্বর, র্যাশ বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।