প্রতিবছর পৃথিবী থেকে ৩.৮৩ সেন্টিমিটার দূরে সরছে চাঁদ, বাড়ছে দিনের দৈর্ঘ্য

প্রকাশিত: 3:10 PM, July 24, 2026

পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যকার চিরন্তন সম্পর্কের মাঝে এক নীরব পরিবর্তন ঘটছে। রাতের আকাশে আলো ছড়ানো আমাদের একমাত্র উপগ্রহটি এক জায়গায় স্থির নেই, বরং কোটি কোটি বছর ধরে এটি নিঃশব্দে দূরে সরে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা গত পাঁচ দশক ধরে সংগৃহীত লুনার লেজার রেঞ্জিং তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সম্প্রতি জানিয়েছেন, প্রতিবছর পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব ৩ দশমিক ৮৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে। এই পরিমাপের ফলাফলে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৯ মিলিমিটারের সূক্ষ্ম তারতম্য থাকতে পারে। তাই বর্তমানে ব্যবহৃত সবচেয়ে নিখুঁত ভৌত পরিমাপগুলোর একটি হিসেবে এই পদ্ধতিকে বিবেচনা করা হয়।

লেজার রশ্মির যাতায়াতের সময় মেপে পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব পরিমাপ করা হয়ে থাকে। এই পরিমাপে সূক্ষ্মতার মাত্রা প্রায় এক মিলিমিটার। গত তিন দশক ধরে সাব-মিলিমিটার পর্যায়ের নিখুঁত তথ্যের সাহায্যে চাঁদ দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরির তথ্যমতে, বর্তমানে নিউ মেক্সিকো, ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানিতে অবস্থিত চারটি পর্যবেক্ষণাগার নিয়মিত এই লেজার পরিমাপের কাজ করে। এগুলোর মধ্যে নিউ মেক্সিকোর অ্যাপাচি পয়েন্ট অবজারভেটরি লুনার লেজার-রেঞ্জিং অপারেশন বা ‘অ্যাপোলো’ সবচেয়ে নিখুঁত তথ্য দিয়ে থাকে।

এই পরিমাপের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে, যখন অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠে কিছু বিশেষ আয়না বা রেট্রোরিফ্লেক্টর অ্যারে রেখে এসেছিলেন। সেসব আয়নায় লেজার রশ্মি পাঠিয়ে মূলত দূরত্ব মাপা হয়। মানুষের জীবনকালের তুলনায় চাঁদের দূরে সরে যাওয়ার এই গতি খুবই সাধারণ, যা মানুষের হাতের নখ বাড়ার হারের সমান। একজন মানুষের পুরো জীবদ্দশায় চাঁদ মাত্র তিন মিটারের মতো দূরে সরে যায়। অর্থাৎ, মানব ইতিহাসের ৫ হাজার বছরে চাঁদের দূরত্ব বেড়েছে প্রায় ১৯০ মিটার। তাই সাধারণ চোখে চাঁদকে আগের জায়গায় স্থির মনে হলেও ভৌগোলিক সময়ের বিচারে এটি বেশ বড় উদ্বেগের বিষয়।

১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে অ্যাপোলো–১১ মিশনের নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন চাঁদের ‘প্রশান্তির সাগর’ অঞ্চলে প্রথম লেজার রিফ্লেক্টর স্থাপন করেন। এই আয়নায় ১০০টি বিশেষ ধরনের কোয়ার্টজ-গ্লাস প্রিজম ছিল, যার বৈশিষ্ট্য হলো যেকোনো আলো যেদিক থেকে আসে, সেদিকেই সরাসরি ফেরত পাঠানো। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে অ্যাপোলো–১৪ ও অ্যাপোলো–১৫ মিশন আরও কিছু আয়না বসায়। এর মধ্যে অ্যাপোলো–১৫ যান থেকে বসানো আয়নাটি ছিল সবচেয়ে বড়, যাতে ৩০০টি কোয়ার্টজ প্রিজম ছিল। বর্তমান দূরত্বের হিসাব বের করতে মূলত এটিই বেশি ব্যবহৃত হয়।

বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, চাঁদ দূরে সরে যাওয়ার পেছনের মূল কারণ হলো জোয়ার-ভাটার ঘর্ষণ। পৃথিবীর আহ্নিক গতি, চাঁদের মহাকর্ষ বল এবং পৃথিবীর মহাসাগর ও ভূত্বকের যৌথ ক্রিয়ার ফলে এটি ঘটে থাকে। চাঁদের মহাকর্ষ বল পৃথিবীর কাছের অংশে যতটা তীব্র, দূরের অংশে ততটা নয়। আকর্ষণ বলের এই পার্থক্যের কারণে পৃথিবী সামান্য উপবৃত্তাকার রূপ নেয়, যা উভয় দিকে জোয়ারের সৃষ্টি করে। পৃথিবীর নিজের অক্ষের ওপর ঘোরার গতি চাঁদের কক্ষপথে ঘোরার গতির চেয়ে বেশি। পৃথিবীর একবার ঘুরতে সময় লাগে ২৪ ঘণ্টা, যেখানে চাঁদের একবার কক্ষপথ ঘুরতে সময় লাগে ২৭ দশমিক ৩ দিন। পৃথিবী নিজের অক্ষে দ্রুত ঘোরার কারণে জোয়ারের ঢেউকে চাঁদের অবস্থানের কিছুটা সামনে টেনে নিয়ে যায়। ফলে জোয়ারের অংশটি চাঁদের সোজা নিচে না থেকে কিছুটা এগিয়ে থাকে এবং এই এগিয়ে থাকা অংশটি চাঁদের ওপর সামনের দিকে সামান্য মহাকর্ষীয় টান প্রয়োগ করে। এর ফলে বাড়তি শক্তি পাওয়ার কারণে চাঁদের কক্ষপথ বড় হতে থাকে এবং চাঁদ প্রতিবছর কিছুটা উঁচু কক্ষপথে উঠে যায়। কৌণিক ভরের সংরক্ষণ সূত্র অনুযায়ী চাঁদ যে শক্তি পায়, তা আসে পৃথিবীর ঘূর্ণনগতি থেকে। এতে পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘোরার গতি কমে যায় এবং দিনের দৈর্ঘ্য বড় হতে থাকে।

চাঁদ গত সাড়ে চার শ বছর ধরে দূরে সরে যাচ্ছে এবং পৃথিবী যত দিন ঘুরতে থাকবে, তত দিন এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। চাঁদ দূরে সরে যাওয়ার প্রথম দৃশ্যমান প্রভাব হলো পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাওয়া। আর তাই প্রতি শতাব্দীতে দিনের দৈর্ঘ্য এক থেকে দুই মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে। ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, প্রায় ১০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর এক দিনের সময়সীমা ছিল মাত্র ১৯ ঘণ্টা এবং তখন চাঁদ অনেক কাছে ছিল। ভবিষ্যতে দিনের দৈর্ঘ্য আরও বড় হতে থাকবে।

বর্তমানে সূর্য ও চাঁদের আকার আকাশে প্রায় সমান দেখায় বলেই পৃথিবীতে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা সম্ভব হয়। সূর্যের ব্যাস চাঁদের চেয়ে ৪০০ গুণ বড় হলেও সূর্য চাঁদ থেকে ৪০০ গুণ দূরে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক সামঞ্জস্যের কারণে চাঁদ মাঝেমধ্যে সূর্যকে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদ দূরে সরে যাওয়ায় আকাশে তার দৃশ্যমান আকার ছোট হতে থাকবে এবং এর ফলে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সংখ্যা কমে যাবে। বর্তমান গণনা অনুযায়ী, প্রায় ৬০ কোটি বছর পর পৃথিবী থেকে শেষ পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এরপর মহাসাগরে চাঁদের কারণে তৈরি হওয়া জোয়ারের উচ্চতা কমে যাবে। ভরা কটাল ও মরা কটাল থাকলেও চাঁদ দূরে চলে যাওয়ার কারণে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র, সামুদ্রিক প্রাণীদের প্রজনন ও মৎস্যসম্পদে ধীরে ধীরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।