শীতের সন্ধ্যায় নতুন বাসার সন্ধানে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা প্রকাশিত: ২:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৮, ২০২৬ নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। সারা দেশে শীতের আমেজ থাকলেও ঢাকায় তীব্র শীত ছিল না, তবে গত দুদিনের ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে নগরে ঠান্ডা ঝেঁকে বসেছে। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই অফিস শেষে বাসা খুঁজতে বের হতে হয়, কারণ ডিসেম্বরে নতুন বাসায় উঠতে হবে। দাদির মৃত্যুর কারণে গ্রামের বাড়িতে থাকায় বাসা খোঁজার কাজটা পিছিয়ে গিয়েছিল। বৃষ্টির টিপটিপে শব্দ আর রাস্তায় কাদার মধ্যে ছাতা ছাড়া বের হওয়াটা ছিল এক বড় ভুল। অফিস থেকে বের হয়ে স্ত্রী কনার সাহায্য নিতে হয়। যে বাসাটি দেখতে যাওয়া হয়, সেটি ছিল একটি পুরোনো ধাঁচের ভবনের তিনতলার দক্ষিণ পাশের ফ্ল্যাট। এর পাশেই একটি মন্দির থাকায় কনা শব্দ নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছিল। বাসাটি ছিল ছোট, দুই রুমের, টাইলসবিহীন প্লেন ফ্লোরের একটি ফ্ল্যাট। ড্রয়িং-ডাইনিং স্পেস এতই ছোট যে ছয় চেয়ারের টেবিল রাখলে সোফা বা ফ্রিজ রাখার জায়গা পাওয়া কঠিন। বারান্দাটি ছিল খুবই সংকীর্ণ। তবুও বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং অফিসের কাছাকাছি হওয়ার কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাসাটি নিতে হয়েছিল। বাসায় ওঠার চার মাস পর মন্দিরের সামনে থাকা চাপকলে পানি নিতে আসা বনলতার সঙ্গে পরিচয় হয়। জীবনানন্দ দাশের কবিতার বনলতার নাম অন্য কারো হতে পারে, তা লেখকের মাথায় ছিল না। বনলতার সঙ্গে সেই প্রথম আলাপে সে জানায়, তাদের শোবার ঘর থেকে লেখকের ব্যালকনি দেখা যায়। পাটোয়ারী মঞ্জিল নামের এই বাড়িটি একসময় হিন্দু পরিবারের ছিল, যারা দেশ ত্যাগের আগে এক মুসলমানের কাছে এটি বিক্রি করে দেয়। বনলতা জানায়, সে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে এবং তার দাদা তাকে আর পড়তে দেননি। পড়াশোনা না করার কারণ হিসেবে সে জানায়, রমা দিদির মতো জুতার কারখানায় কাজ করা বা জামাইয়ের ঘরে রান্নাই তাদের নিয়তি। রমা দিদির কথা জানতে চাইলে বনলতার মুখ অন্ধকার হয়ে যায় এবং সে জানায় রমা দিদি বেঁচে নেই। এরপর বহু সময় পার হয়েছে। কভিডের ভীতি কেটে যাওয়ার পর জীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে। লেখকের সংসার জীবনেও পরিবর্তন এসেছে; কনার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় রুটিন জীবন ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। চাকরি হারানোর পর গ্রাম থেকে ফিরে নতুন চাকরি পেলেও বনলতার কথা প্রায় ভুলতে বসেছিলেন লেখক। কিন্তু একদিন অফিসফেরত সন্ধ্যায় আবার বনলতার সঙ্গে দেখা হয়। তার চোখের নিচে কালি ছিল, যেন কোনো করুণ দীর্ঘশ্বাস। বহু বছর পর এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন লেখক। নিজের বেডরুমে দাঁড়িয়ে বনলতা তাকে প্রশ্ন করে, তার মুখ কেন দেখা যাচ্ছে না। ড্রিম লাইটের আলোয় আয়নায় তাকিয়ে লেখক দেখেন, তার নিজেরই কোনো মুখ নেই। বনলতা তখন হাসতে হাসতে বলে, সে কাছেই আছে। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকালে লেখক নিজেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান, পাশে বনলতার মুখ। আর দূরে সবুজ শাড়ি পরা কনা দাঁড়িয়ে হাসছে, যার স্থির ও শান্ত চোখ বলছে, এ পাড়ায় কোনো বনলতা থাকে না। SHARES সাহিত্য বিষয়: ঢাকাবনলতাবাসাসাহিত্যস্মৃতি