এসএসসির ফল বিপর্যয়: জিপিএ-৫ ও পাসের হারের চেয়ে জীবন অনেক বড়

প্রকাশিত: ১১:৩৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২৬

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, যা দেশের লাখো পরিবারে একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতি তৈরি করেছে। একদিকে জিপিএ-৫ পাওয়ার উচ্ছ্বাস ও মিষ্টি বিতরণের দৃশ্য, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে কোনো কোনো শিক্ষার্থীর ঘরে নেমে এসেছে নীরবতা ও কান্না। এবারের পরীক্ষায় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর অর্থ হলো, প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৩৮ জনই এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এছাড়া জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ১ লাখ ১৬ হাজারের কিছু বেশি, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইংরেজি ও গণিতের মতো দুটি মৌলিক বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়াই সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়ার মূল কারণ। এই বাস্তবতায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যারা সফল হয়েছে তাদের কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যাবে এবং যারা সফল হতে পারেনি, সমাজ ও অভিভাবক হিসেবে তাদের পাশে কীভাবে দাঁড়ানো উচিত। সফল শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলা হয়েছে, এসএসসি কোনো শেষ গন্তব্য নয়, এটি কেবল দীর্ঘ যাত্রার শুরু। জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই যেমন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হওয়া নয়, তেমনি কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া মানেও সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপগুলোতে সফল হতে হলে শেখার আগ্রহ, শৃঙ্খলা ও বিনয় ধরে রাখতে হবে।

যারা অকৃতকার্য হয়েছে বা প্রত্যাশিত ফল পায়নি, তাদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে যে একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে কোনো মানুষের মেধা, সম্ভাবনা বা জীবনের মূল্য নির্ধারিত হতে পারে না। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে শুরুতে হোঁচট খাওয়া মানুষগুলোই পরবর্তীতে সফলতার শীর্ষে পৌঁছেছেন। এই সাময়িক কষ্টকে শক্তিতে রূপান্তর করে ইংরেজি ও গণিতের ভিত্তি শক্ত করার জন্য এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। থেমে যাওয়ার মধ্যেই প্রকৃত ব্যর্থতা নিহিত, পুনরায় চেষ্টা করার মধ্যে নয়।

এই সংবেদনশীল সময়ে অভিভাবকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ফল খারাপ করা সন্তানের এই মুহূর্তে পরিবার ও বাবা-মায়ের সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অন্য কারও সঙ্গে তুলনা বা মানসিক তিরস্কার কিশোর মনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে, যা অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দেয়। তাই সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরে বিশ্বাস করাতে হবে যে কোনো কাগজের নম্বরের চেয়ে তাদের জীবন অনেক বেশি মূল্যবান।

একই সঙ্গে এবারের ফলাফল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্য হওয়া প্রমাণ করে যে দায় কেবল শিক্ষার্থীর একার নয়। এটি মূলত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, গ্রাম ও শহরের শিক্ষা বৈষম্য এবং মুখস্থনির্ভর ব্যবস্থারই ব্যর্থতা। মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি ও গণিতের ভিত্তি দুর্বল থাকলে উচ্চশিক্ষার প্রতিটি ধাপে শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড সংগ্রাম করতে হয়। তাই শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার এখনই উপযুক্ত সময়। জীবন কোনো এক দিনের মার্কশিট বা ৩ ঘণ্টার পরীক্ষার ফল নয়, এটি একটি দীর্ঘ ম্যারাথন। যারা আজ হোঁচট খেয়েছে, তারাও কাল ঘুরে দাঁড়িয়ে দেশের সমান অংশীদার হবে।