তৃণমূল থেকে কি সহনশীল রাজনীতির প্রত্যাবর্তন সম্ভব? প্রকাশিত: ৭:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২৬ জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাস পুনরায় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে কয়েক দিনের ব্যবধানে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যকার টানাপোড়েন সংসদীয় দর-কষাকষির সীমানা পেরিয়ে রাজপথে গড়িয়েছে। জুলাইয়ে যে প্রত্যাশা ছিল—নতুন বাংলাদেশ সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে হাঁটবে, তা ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বছরের শেষভাগে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দুটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই নির্বাচন কি দলগত দখলদারির নতুন রণক্ষেত্র হবে, নাকি তৃণমূল থেকে সহনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্র পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করবে? স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি প্রায় দুই বছর ধরে চলছে এবং বর্তমানে অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা সরকার নিযুক্ত প্রশাসকদের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবরে প্রথম ধাপের ভোট শুরুর কথা রয়েছে, যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ১০ থেকে ১২ মাস সময় লাগতে পারে। দেশে বর্তমানে সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ, প্রায় ৩৩০টি পৌরসভা, প্রায় ৪৯৫টি উপজেলা এবং নতুন গঠিত বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। স্থানীয় গণতন্ত্রকে ফরাসি চিন্তাবিদ আলেক্সি দ্য ট্যকভিল ‘গণতন্ত্রের পাঠশালা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেখানে নাগরিকরা শাসন, দেনদরবার ও সিদ্ধান্তের দায়বদ্ধতা শেখে। রবার্ট পাটনামের গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক পুঁজি ও নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় শাসন কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। কার্যকর স্থানীয় গণতন্ত্র কেন্দ্রীয় ক্ষমতার তীব্র প্রতিযোগিতার চাপ শুষে নিতে সক্ষম হতে পারে। তবে এই নির্বাচনকে একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে স্থানীয় নির্বাচন মাস্তান, পেশিশক্তি ও কালোটাকার দখলদারির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, কেন্দ্রীয় সংঘাত স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতাকে জাতীয় রূপ দিতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো এখনো বাস্তবায়িত না হওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশন কর্তৃত্ব ও কার্যাবলির প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করলেও তা পর্যালোচনার উদ্যোগ সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনে দলগত প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয় প্রতীক সংঘাত কমাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিএনপি প্রার্থী বাছাই নিয়ে ভাবছে এবং জামায়াত-শিবিরও সংগঠিত হচ্ছে; প্রতীক না থাকলেও প্রক্সি প্রার্থীর মাধ্যমে দলগত বিভাজন থাকবেই। এছাড়া নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের আইনি নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তফসিল ঘোষণার আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং নির্বাচন কমিশনকে বড় দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। সবশেষে, স্থানীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হলে তা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের বৈধতাকেও শক্তিশালী করবে। SHARES মতামত বিষয়: গণতন্ত্রজুলাই অভ্যুত্থানরাজনীতিসংস্কারস্থানীয় সরকার নির্বাচন