জোরপূর্বক শিক্ষকের পদত্যাগপত্রের আইনি বৈধতা নেই: হাইকোর্ট প্রকাশিত: ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনি কোনো বৈধতা নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর (13 September 2026) প্রকাশিত এই রায়ে বলপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া শিক্ষককে অবিলম্বে স্বপদে পুনর্বহাল করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আদালতের এই নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, পর্ষদের সভাপতিকে অপসারণ করা এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধের মতো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। 'মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র' মামলায় হাইকোর্ট এই যুগান্তকারী রায় দেন। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের 'গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়'-এর প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন করা হয়েছিল। সেটির চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন। সম্প্রতি এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে, যা লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. ইকবাল কবির। আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল এবং মানবেন্দ্র রায়। অন্যদিকে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম। রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, রিটকারী শিক্ষকের পদত্যাগপত্রটি স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি; বরং তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। আইন বা বিধি কোনোভাবেই চাপের মুখে নেওয়া এ ধরনের পদত্যাগকে সমর্থন করে না এবং এর কোনো আইনগত বৈধতা নেই। মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়। এর পরদিন ১৫ আগস্ট এ বিষয়ে তিনি কালিয়াকৈর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে তিনি লিখিত আবেদন করেন। এর পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি অবহিত করে আইনি প্রতিকার চান। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে বহাল করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই আদেশ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় উপযুক্ত প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে জোর করে নেওয়া ওই পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। পরে চলতি বছরের ২০ আগস্ট পূর্বের জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত রায় দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্ট বলেন, প্রকৃতপক্ষে রিট আবেদনকারীর পদত্যাগের আইনি কোনো বৈধতা ছিল না এবং তিনি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তার এমপিও অংশ (বেতন-ভাতা) পাচ্ছিলেন। এই অবস্থায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ তাকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে বা চাকরিতে বহাল করতে আইনিভাবে বাধ্য এবং তিনি অবিলম্বে পুনর্বহাল হওয়ার অধিকারী। আদালত আরও বলেন, আইন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে শিক্ষা বোর্ডের এখতিয়ার রয়েছে ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক প্রস্তাবিত যেকোনো শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন বা বাতিল করার। সেই অনুযায়ী বোর্ডের পক্ষ থেকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রতি জারি করা নির্দেশাবলী তাদের জন্য বাধ্যতামুলক ছিল। উক্ত নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে পালন না করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বিবাদীগণ সংবিধিবদ্ধভাবে ও আইনগতভাবে বাধ্য। বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক অবহেলা এবং সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা রিটকারীর বৈধ অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। আদালত নির্দেশনাসহ রুলটি নিষ্পত্তি করে বলেন, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে রিট আবেদনকারীকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হলো। এই নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এর মধ্যে ম্যানেজিং কমিটি বাতিল করা, কমিটির সভাপতিকে অপসারণ করা এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক (যিনি ম্যানেজিং কমিটির সদস্য-সচিব) তার এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। SHARES জাতীয় বিষয়: আইনি বৈধতাআলকাছ উদ্দিন আহমেদগোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়জোরপূর্বক পদত্যাগশিক্ষক পদত্যাগহাইকোর্ট