খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্পে অব্যবস্থাপনা, মিলছে না প্রত্যাশিত পানি প্রকাশিত: 10:04 AM, August 6, 2026 খুলনা নগরবাসীর সুপেয় পানির দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনের লক্ষে ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত 'খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-১)' নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই মেগা প্রকল্পটি অর্থায়ন করেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটি চালুর পর থেকে পরিশোধনের পরও পানিতে লবণ থাকা, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব এবং বছরের অধিকাংশ সময় পানি সরবরাহ করতে না পারার অভিযোগ নিয়মিত উঠে আসছে। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাগেরহাটের মোল্লাহাট এলাকার মধুমতি নদী থেকে পানি এনে শোধনের মাধ্যমে সরবরাহ করা। এর আওতায় মধুমতি নদীর তীরে ইনটেক ফ্যাসিলিটি, রূপসার সামন্তসেনায় ১১ কোটি লিটার ধারণক্ষমতার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ৩৪ কিলোমিটার পাইপলাইন এবং নতুন নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। তবে বর্তমানে প্রকল্পটিতে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছে। শোধনাগারের ছয়টি সাবমার্সিবেল পাম্পের মধ্যে তিনটিই নষ্ট, যার ফলে প্রতিদিন প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম পানি উৎপাদিত হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের ট্রান্সমিশন পাইপলাইন কাটাখালী খালের অংশে মাটির উপরে ভেসে উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী এটি ৫০ ফুট গভীরে বসানোর কথা থাকলেও মাত্র ২০ ফুট গভীরে স্থাপন করা হয়েছিল। এছাড়া বর্তমানে উৎপাদিত প্রায় ৬ কোটি লিটার পানির মধ্যে ২০ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লিটার পানি সিস্টেম লস হিসেবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত নগর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নন-রেভিনিউ ওয়াটারের হার ওয়ান ডিজিটে রাখার চেষ্টা করা হয়। সেখানে খুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষতি উদ্বেগজনক। পানি ঘাটতির বিষয়ে প্রকৌশলী আরমান হোসেন বলেন, পানির ঘাটতি থাকবে। ৪৪-৪৫ হাজার গ্রাহককে পানি দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহক বাড়লে পানি বিক্রির পরিমাণও বাড়বে। তখন আয় বেশি হবে। তার দাবি, সিস্টেম লস যেটা হয় সেটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঠিক আছে। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল হোসেনের মতে, দক্ষ জনবল দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ না করায় যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। আর্থিক দিক থেকেও প্রকল্পটি সংকটে রয়েছে। জাইকা ও এডিবি থেকে নেওয়া ঋণ ৩০ বছরের মধ্যে পরিশোধের চুক্তি থাকলেও এখন পর্যন্ত এক টাকাও শোধ করা সম্ভব হয়নি। অথচ প্রতিবছর ৩০ কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি থেকে আয় মাত্র ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যার বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা এই প্রকল্পকে ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে বলেন, তৎকালীন ওয়াসা ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক, প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা মিলে লুটপাটের মাধ্যমে প্রকল্পটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। খুলনা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ জানিয়েছেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খুলনা ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, খুলনায় ওয়াসা একটি প্রকল্প গ্রহণ করে ২০১১ সালে। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো। বাগেরহাটের মোল্লাহাট এলাকার মধুমতি নদী থেকে পানি এনে তা শোধনের মাধ্যমে নগরবাসীকে সরবরাহ করার কথা। প্রকল্পের প্রধান কাজগুলো ছিল, মধুমতি নদীর তীরে ইনটেক ফ্যাসিলিটি স্থাপন, পানি শোধনাগার, রূপসার সামন্তসেনায় ১১ কোটি (১১০ এমএলডি) লিটার ধারণক্ষমতার বিশাল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও ইম্পাউন্ডিং জলাধার নির্মাণ, মধুমতি নদী থেকে শোধনাগার পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটারের বেশি কাঁচা পানি সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন, নগরীতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ওভারহেড ট্যাংক বা জলাধার নির্মাণ এবং নতুন পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপন। এই মেগা প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটি ২০১৯ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। প্রকল্পটি নেওয়ার সময় দাবি করা হয়েছিল, রূপসার সামন্তসেনা পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন ১১ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের মাধ্যমে নগরবাসীর পানির সংকট অনেকটাই দূর হবে। লক্ষ্য পূরণ তো সম্ভব হয়নি, উলটো বিপুল পরিমাণ পানি অপচয়ের অভিযোগ সামনে এসেছে। SHARES রাজধানী বিষয়: খুলনাখুলনা ওয়াসাজাইকাপানি সংকটপ্রকল্প অনিয়ম