শৈশবের বায়েজিদ হারিকেনের আলো আজও নেভেনি শাহজালাল ফিরোজের মনে

প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৮, ২০২৬

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার বাদলপাড়া গ্রামের সেই মেঠো পথ এখন পাকা রাস্তা হয়েছে, বাঁশের সাঁকোর জায়গায় বসেছে কালভার্ট আর ব্রিজ। সন্ধ্যার পর বৈদ্যুতিক আলোয় চায়ের আড্ডায় মুখর থাকে রাস্তার পাশের টংঘরগুলো। অথচ ষাটের দশকে এই গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। তখন পুরো গ্রামের অন্ধকার দূর করার একমাত্র ভরসা ছিল ‘বায়েজিদ’ মার্কা হারিকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজালাল ফিরোজের স্মৃতিতে আজও অমলিন সেই হারিকেনের নরম হলুদ আলো আর মায়ের স্নেহভরা কণ্ঠ।

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে শাহজালাল ফিরোজ জানান, বরিশালের রাঙামাটি নদীর ওপারে সূর্য ডুবলেই চরামদ্দি ইউনিয়নের বাদলপাড়া গ্রামে নেমে আসত গভীর অন্ধকার। তখন তাঁর মা ‘মেড ইন ইংল্যান্ড’ লেখা এবং কাচের গায়ে বাদুড়ের ছবি থাকা বায়েজিদ হারিকেনটি জ্বালাতেন। সলতেটা একটু উসকে দিলেই কাচের চিমনির ভেতরের হলুদ শিখাটা কেঁপে উঠত এবং ছোট ঘরটি ভরে উঠত নরম আলোয়। প্রতিদিন বিকেলে নরম কাপড় ভেতরে ঢুকিয়ে আগের রাতের কালি পরিষ্কার করার দায়িত্ব ছিল তাঁর নিজের। দোতলা টিনের ঘরে তিন ভাই ও চার বোনের সেই সংসারে ওই একটি শিখাই ছিল সন্ধ্যার সবকিছু।

সন্ধ্যার পর হারিকেনের আলোয় মায়ের পাশে বসে সীতানাথ বসাকের ‘আদর্শলিপি’ পড়তেন তিনি। মা তাঁকে অক্ষর চেনাতেন। তালপাতা সেদ্ধ করে শুকিয়ে রাখা হতো এবং লোহার সুচালো কলম দিয়ে কেউ একজন পাতায় বাংলা ও ইংরেজি অক্ষর খোদাই করে দিতেন। কয়লার গুঁড়া গুলে কালি বানিয়ে বাঁশের কঞ্চির কলম দিয়ে সেই খোদাই করা অক্ষরের ওপর হাত ঘোরাতেন তিনি। শীতের রাতে হারিকেনের আলোর সঙ্গে চাঁদের আলো মিশে এক অন্যরকম ভালোলাগা তৈরি হতো। মা শোনাতেন চাঁদের বুড়ির সুতা কাটার গল্প কিংবা নানা রকমের ভূতের গল্প। ভয় পেয়ে ভাইবোনেরা সবাই মিলে গুটিসুটি মেরে বসত এবং একে একে চিমনির গরম কাচে হাত রেখে আঙুল গরম করত।

তাঁদের বাড়ি থেকে রাঙামাটি নদী বেশি দূরে ছিল না। সন্ধ্যার পর নদীতেও হারিকেন জ্বলত। জেলেরা ছোট ছোট নৌকায় হারিকেন ঝুলিয়ে জাল ফেলতেন। কখনো খোট জাল, কখনো লম্বা টানা জাল। ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ আর বিভিন্ন জাতের মাছে ভরে উঠত নৌকা। দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে মনে হতো নদীর বুকে জোনাকিরা ভেসে বেড়াচ্ছে। তখন বাজারে অত্যন্ত কম দামে ভালো মাছ পাওয়া যেত এবং কেউ সের হিসেবে মাছ কিনত না।

১৯৬৭ সালে চরামদ্দি ডব্লিউ কে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর শাহজালাল ফিরোজ বরিশাল বিএম কলেজে ভর্তি হন। সেখানেই তিনি জীবনে প্রথম বৈদ্যুতিক আলো দেখেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি নেন। কর্মজীবন ও সংসার পেরিয়ে এখন তিনি অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁর তিন মেয়ের মধ্যে দুজন বর্তমানে দেশের বাইরে এবং একজন ঢাকায় সপরিবার বসবাস করছেন।

সময়ের ব্যবধানে এখন আর গ্রামে যাওয়া হয় না বললেই চলে। তবে ২০১৪ সালে গ্রামের বাড়ির ঘরের কোণে পুরোনো জিনিসের ভেতর থেকে একটি ভাঙা ও মরিচা ধরা বায়েজিদ হারিকেন উদ্ধার করেন তিনি, যার চিমনিটি ছিল না। স্মৃতির টানে ওটা আর ফেলে দিতে পারেননি। শাহজালাল ফিরোজ বলেন, সময় তাঁকে অনেক দূরে নিয়ে এলেও শৈশবের সেই বায়েজিদ হারিকেনের ভেতরের আলোটা আজও তাঁর মনে নেভেনি।

তবু ওটা ফেলতে পারিনি।.২.চরামদ্দি ডব্লিউ কে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করলাম ১৯৬৭ সালে।

কিন্তু বায়েজিদ হারিকেনের সেই আলোটা আমার ভেতরে আজও নেভেনি।শাহজালাল ফিরোজ, সড়ক ২৭, ব্লক–এ, বনানী, ঢাকা