ভবিষ্যতের বুদ্ধিমান রোবট তৈরিতে কৃত্রিম সিন্যাপস প্রযুক্তির সম্ভাবনা

প্রকাশিত: 3:30 PM, August 3, 2026

সাধারণ কৃত্রিম সিন্যাপসগুলো নির্দিষ্ট ধরনের সংকেতের ওপর নির্ভরশীল হলেও, মানুষের মস্তিষ্ক চোখ, কান, ত্বক, নাক ও জিহ্বা থেকে আসা বিভিন্ন তথ্য একসঙ্গে গ্রহণ ও বিশ্লেষণ করে। এই সক্ষমতাকে অনুসরণ করে বর্তমানে বহুমাত্রিক কৃত্রিম সিন্যাপস তৈরির কাজ চলছে, যা বৈদ্যুতিক সংকেতের পাশাপাশি আলো, শব্দ, তাপমাত্রা ও গ্যাসের মতো বাহ্যিক উদ্দীপনায় প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম। ভবিষ্যতে মানুষের মতো বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ব্যবহার করতে পারা বুদ্ধিমান রোবট তৈরিতে এই প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখবে।

কৃত্রিম সিন্যাপসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সিন্যাপটিক প্লাস্টিসিটি। উদ্দীপনা পাওয়ার পর ডিভাইসের বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যে যে পরিবর্তন আসে এবং উদ্দীপনা বন্ধ হওয়ার পরও তা কিছু সময় স্থায়ী হয়, তা মূলত মানুষের মস্তিষ্কে স্মৃতি তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনীয়। এই অসংখ্য সিন্যাপসকে যুক্ত করে নিউরোমরফিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব, যেখানে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ একই কাঠামোয় সম্পন্ন হবে। এতে প্রচলিত কম্পিউটারের মতো প্রসেসর ও মেমরির মধ্যে বারবার তথ্য আদান-প্রদানের প্রয়োজন কমে যাবে এবং শক্তি সাশ্রয় হবে।

বৈদ্যুতিক কৃত্রিম সিন্যাপসের ক্ষেত্রে মেমরিস্টর একটি অপরিহার্য উপাদান। এর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে রোধ পরিবর্তিত হয় এবং বিদ্যুৎ সরিয়ে নিলেও সেই পরিবর্তন স্থায়ী হয়, যা একে স্মৃতিশীল বৈদ্যুতিক উপাদান হিসেবে কার্যকর করে তোলে। মেমরিস্টরের রোধ পরিবর্তনের পেছনে আয়নের স্থানান্তর বা ইলেকট্রনের আচরণের মতো ভৌত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া কাজ করে। কোনো কোনো ডিভাইসে অক্সিজেন আয়নের গতিবিধির ফলে অক্সিজেন শূন্যস্থান তৈরি হয়, যা বিদ্যুৎ চলাচলের পরিবাহী পথ গঠনে ভূমিকা রাখে। আবার Ag⁺ বা Cu²⁺-এর মতো ধাতব আয়নও ডিভাইসের ভেতরে স্থানান্তরিত হয়ে ক্ষুদ্র পরিবাহী ফিলামেন্ট তৈরি করতে পারে। এই ফিলামেন্ট তৈরি হলে রোধ কমে যায় এবং ভেঙে গেলে রোধ বেড়ে যায়।

হেক্সাগোনাল বোরন নাইট্রাইড (h-BN) ব্যবহার করে তৈরি একটি কৃত্রিম সিন্যাপসের ক্ষেত্রে উচ্চ ও নিম্ন রোধের মধ্যে পরিবর্তনের শক্তি খরচ প্রায় ৬০০ পিকোওয়াট পর্যন্ত কম পাওয়া গেছে এবং সুইচিংয়ের সময় ১০ ন্যানোসেকেন্ডেরও কম হতে পারে। এছাড়া ফেজ পরিবর্তনের মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণের জন্য GST বা Ge₂Sb₂Te₅-এর মতো পদার্থ স্ফটিক ও অ্যামরফাস অবস্থার মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে। MoTe₂-ও এ ক্ষেত্রে বিশেষ আগ্রহের বিষয়, যেখানে স্ট্রেইন-ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে একটি ডিভাইসে প্রায় ৯০ মিলিভোল্ট সুইচিং ভোল্টেজ এবং প্রায় ১৫০ অ্যাটোজুল সুইচিং শক্তি পাওয়া গেছে।

ফেরোইলেকট্রিক ও ফেরোম্যাগনেটিক প্রভাব ব্যবহার করেও কৃত্রিম সিন্যাপস তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে বৈদ্যুতিক বা চৌম্বকীয় উদ্দীপনার ফলে পদার্থের মেরূকরণ পরিবর্তিত হলে ডিভাইসের রোধও পরিবর্তিত হয়। পাশাপাশি, অপ্টোইলেকট্রনিক কৃত্রিম সিন্যাপস আলো ব্যবহার করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও কম শক্তি খরচ নিশ্চিত করে। এই প্রযুক্তি কৃত্রিম দৃষ্টি তৈরিতে বিশেষ কার্যকর, কারণ এটি সরাসরি আলোকে বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়ায় রূপান্তর করতে পারে। অক্সাইড সেমিকন্ডাক্টরের অক্সিজেন শূন্যস্থানগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বহুমাত্রিক প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয় যানবাহন, স্মার্ট ক্যামেরা, শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, চিকিৎসা-সহায়ক রোবট এবং উন্নত সেন্সরের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যা রোবটকে পরিবেশ উপলব্ধিতে আরও দক্ষ ও মানবসদৃশ করে তুলবে।