নিউ ইয়র্ক টাইমসের মোসাদ-আহমাদিনেজাদ প্রতিবেদন কতটা বিশ্বাসযোগ্য? প্রকাশিত: 11:43 AM, August 6, 2026 জুলাই মাসে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের গোয়েন্দা সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়েছে। অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি দলের তৈরি এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মোসাদের লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ পরবর্তী ইরানে আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানো। প্রতিবেদনটিতে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে গোপন বৈঠক, মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার সঙ্গে আহমাদিনেজাদের সাক্ষাৎ, গোপনে তাকে অর্থ প্রদান এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে বোমা হামলার শিকার নিজের বাসভবন থেকে আহমাদিনেজাদকে নাটকীয়ভাবে উদ্ধার করার মতো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, আহমাদিনেজাদকে ইরানের ভেতরেই মোসাদের একটি গোপন সেফ হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং সেখান থেকে চলে যান। তিনি নিজে পালিয়েছিলেন নাকি তাকে চলে যেতে দেওয়া হয়েছিল, তা প্রতিবেদনে অস্পষ্ট থেকে গেছে। তবে এই ঘটনা মোসাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে তাতে সন্দেহ নেই। এই প্রতিবেদনের আকর্ষণীয় বয়ান সত্ত্বেও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এতে অনেক অসংগতি ও অবিশ্বাস্য বিষয় ধরা পড়ে। ইরানের ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে যারা জানেন, তারা অবগত আছেন যে প্রেসিডেন্ট সেখানে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নন। মূলত সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর হাতেই দেশের মূল ক্ষমতা ও সংবেদনশীল গোপন তথ্য থাকে। ইসরাইলের উদ্দেশ্য যদি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ কাউকে নিয়োগ করা হতো, তবে আহমাদিনেজাদের বদলে আইআরজিসি বা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেছে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত ছিল। প্রতিবেদনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিবরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, হাঙ্গেরি সরকারের এক কর্মকর্তা বুদাপেস্টের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টরকে আহমাদিনেজাদকে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর অনুরোধ করেছিলেন, যা ছিল মোসাদের সঙ্গে বৈঠকের আড়াল। ইসরাইলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও ‘ইউনিট ৮২০০’-এর সাবেক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হানান গেফেন এই কর্মপদ্ধতি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তার মতে, মোসাদ প্রধানের ব্যক্তিগতভাবে এমন এক টার্গেটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সংস্থার প্রচলিত পদ্ধতির চরম লঙ্ঘন। এছাড়া, ২০২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানের জন্য একটি জলবায়ু সম্মেলনকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা এবং অন্য কোনো সরকারের সঙ্গে এমন সংবেদনশীল তথ্য ভাগ করা গোয়েন্দা কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরবর্তী নেতা হিসেবে আহমাদিনেজাদের নাম বিবেচনা করাটাও ছিল অদ্ভুত। গত ২৫ বছরে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি হলোকস্ট অস্বীকার, ইসরাইল ধ্বংসের ডাক এবং পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদারের পক্ষে কথা বলে এসেছেন। ইরানের শাসকগোষ্ঠী তাকে একাধিকবার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেছে এবং সংস্কারপন্থি বা কট্টরপন্থি—কারও কাছেই তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এই পরিকল্পনাটিকে অবাস্তব বলে মনে করতেন। তারা সতর্ক করেছিলেন যে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে ইসরাইলের অবস্থান আরও খারাপ হতে পারে। তাই এই প্রতিবেদনের তথাকথিত কৌশলগত যৌক্তিকতা বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বাইরের পর্যবেক্ষকদের যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। SHARES মতামত বিষয়: ইরানইসরাইলগোয়েন্দা প্রতিবেদননিউ ইয়র্ক টাইমসমাহমুদ আহমাদিনেজাদমোসাদ