পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ বিপর্যয় ও ভুল উন্নয়ন দর্শনের মাশুল

প্রকাশিত: 5:12 PM, July 22, 2026

সম্প্রতি টানা ভারী বর্ষণে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যা এবং পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে এই বিপর্যয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রতি বর্ষায় এই অঞ্চলে বন্যা ও পাহাড়ধস এবং শুষ্ক মৌসুমে তীব্র সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। আপাতবিপরীত মনে হওয়া এই দুই সংকট আসলে একই পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভিন্ন প্রকাশ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে এসব দুর্যোগের জন্য সাধারণত দায়ী করা হলেও এর পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচার পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অবকাঠামো নির্মাণ এবং স্থানীয় আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত পরিবেশগত জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক চর্চার অবমূল্যায়ন বড় ভূমিকা রাখছে।

এই পরিবেশগত সংকটের সূচনা হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনামলে। ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় আদিবাসীদের সম্মতি ও অংশগ্রহণ ছাড়াই সংরক্ষিত বন ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন করা হয়, যা বননির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকার খর্ব করে। সাঙ্গু সংরক্ষিত বন ছাড়া অধিকাংশ প্রাকৃতিক বনকে কেটে সেগুনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক বৃক্ষের বাগানে রূপান্তর করা হয়। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলেও এই ঔপনিবেশিক উন্নয়ন দর্শন বহাল থাকে, যার সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয়তাবাদী ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলার অংশ হিসেবে সমতল থেকে চার লক্ষাধিক বাঙালিকে পাহাড়ে পুনর্বাসন করা হয়। পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকা এই জনগোষ্ঠী এবং নীতিনির্ধারক ও আমলাদের সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতিকে উপেক্ষা করে পর্যটনকেন্দ্রিক রিসোর্ট, সড়ক ও সীমান্ত সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় আদিবাসীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দেওয়ায় বনের ক্ষয়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, আকস্মিক বন্যা ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার মতো পরিবেশগত ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। অথচ দেশের মোট বনভূমির প্রায় ৪৩ শতাংশ এবং প্রায় ৮০ শতাংশ জীববৈচিত্র্যের আধার এই পার্বত্য চট্টগ্রামেই অবস্থিত। এই অঞ্চলটি কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, চেঙ্গী, কাসালং ও হালদাসহ অসংখ্য নদ-নদী ও ঝিরি-ঝরনার উৎসস্থল। এসব নদী পাহাড় ও সমতলের মধ্যে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশের ওপর নিবিড়ভাবে নির্ভরশীল। চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যতা সচল রাখতে কর্ণফুলী নদী অপরিহার্য। অন্যদিকে, হালদা নদী দক্ষিণ এশিয়ায় কার্পজাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের সুপেয় পানির প্রধান উৎস। হালদা নদীর অববাহিকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় উজানের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বাঁশঝাড় ও বন সংরক্ষণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও নদী ধ্বংস হলে দেশের পানিসম্পদ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এই অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষা কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয়, এটি জাতীয় স্বার্থের অংশ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের প্রথাগত সামাজিক নিয়ম ও সামষ্টিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালিত ‘পাড়াবন’ রাষ্ট্রীয় বন ব্যবস্থাপনার চেয়েও কার্যকরভাবে বন ও পানির উৎস সংরক্ষণ করে আসছে। এই ব্যবস্থার গুরুত্ব জাতীয় বননীতি ২০২৫-এ স্বীকৃতি পেয়েছে। পাহাড়ের আদিবাসীদের সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও প্রথাগত শাসনব্যবস্থার সঙ্গে প্রকৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সার্কেলের প্রধান ও আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় এবং গবেষক ও উন্নয়নকর্মী ড. হরিপূর্ণ ত্রিপুরার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক দুর্যোগ প্রকৃতির প্রতি দীর্ঘদিনের অবিচার এবং প্রচলিত উন্নয়ন দর্শনের সীমাবদ্ধতারই ফল। এই সংকটের সমাধান শুধু ত্রাণ বিতরণ বা পুনর্বাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালার মৌলিক পুনর্বিবেচনা জরুরি। টেকসই ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃতিকে শোষণের উপাদান না ভেবে পারস্পরিক সহাবস্থানের অংশ হিসেবে দেখতে হবে এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রথাগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।