প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশিত: 11:06 PM, August 1, 2026

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সামান্য জ্বর, মাথাব্যথা বা রক্তচাপের মতো সাধারণ সমস্যার জন্যও মানুষ সরাসরি বড় হাসপাতালে ছুটে যায়, যা হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি রোগীর সময় ও অর্থের অপচয় ঘটায়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণামতে, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ স্বাস্থ্যসমস্যা শুরুতেই মোকাবিলা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান হার দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্বাস্থ্যসেবায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এআই-এর মূল লক্ষ্য কেবল রোগ নির্ণয় নয়, বরং রোগ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং মানুষকে সচেতন করা। বাংলাদেশে বর্তমানে 'ইন্টেলিজেন্ট জেনারেল প্র্যাকটিশনার' (আইজিপি) মডেলের মাধ্যমে প্রযুক্তি ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে এই প্রতিরোধমূলক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই মানবকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা এআই-ভিত্তিক ক্লিনিক্যাল ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম, আইওটি-চালিত ডায়াগনস্টিক ডিভাইস এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন নিশ্চিত করেন।

আইজিপি মডেলের একটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য অ্যাকাউন্ট, যেখানে স্বাস্থ্যতথ্য সংরক্ষিত থাকে। এর ফলে রোগের ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করে জীবনযাত্রার পরিবর্তন বা চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই মডেলটি চিকিৎসকের বিকল্প নয়, বরং স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি কার্যকর সহায়ক। গ্রামীণ এলাকায় এটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলোকে ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করছে, আর শহরাঞ্চলে এলাকাভিত্তিক জিপি সেন্টারের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

এই মডেলটি কেবল জ্বর বা সংক্রামক রোগ নয়, বরং ডায়াবেটিস, মাতৃস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রবীণদের স্বাস্থ্যসহ বিস্তৃত পরিসরে সেবা দিচ্ছে। গত এক দশকে এই মডেলের মাধ্যমে ৩০ লাখের বেশি মানুষ সেবা পেয়েছেন। ৬৫টি ক্যাচমেন্ট এলাকায় ৪ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের ২৫ লাখের বেশি মানুষকে সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৩ হাজারের বেশি নারী স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত 'আলো ক্লিনিক'গুলো ইতিমধ্যে ৫ লাখ মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিয়েছে। ৯ জুলাই ২০২৬ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইউনিসেফের সহযোগিতায় একটি অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালার আয়োজন করে, যা ভবিষ্যতে সরকারি নীতিনির্ধারণে সহায়ক হবে।

বর্তমানে ঢাকার উত্তরায় ব্র্যাকের সাথে অংশীদারত্বে 'আমাদের সুস্বাস্থ্য' উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর ও সাশ্রয়ী সেবা প্রদান করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, গ্রামাঞ্চলে পরিবারপ্রতি প্রায় ১.৫ ডলার এবং শহরে ৩ ডলার ব্যয়ে এই সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান সম্ভব। এটি কেবল ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবাই নয়, বরং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব 'গ্রিন হেলথ' ব্যবস্থারও সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এআই-চালিত এই মডেলটি ভবিষ্যতে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে এবং স্বাস্থ্য খাতের টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।