চুপ্পুর ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাক্টিভ’ ইস্তফা ও কিছু প্রশ্ন

প্রকাশিত: 8:32 PM, July 25, 2026

‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ?’—অঞ্জন দত্তর গানের সেই চরিত্রের মতো রাষ্ট্রপতির মতো রাজকীয় ও রুদ্ধশ্বাস দায়িত্বটি অবলীলায় ছেড়ে দিয়েছেন জনাব মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। বিদেশে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তাঁর দেহে ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ নামক একটি রোগ ধরা পড়ে। এটি কোনো সাধারণ অসুখ নয়, বরং করপোরেট ক্লাসের একটি জটিল শারীরিক অবস্থা। এই রোগের কারণে তিনি হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন এবং হুঁশ ফিরলে সেই সময়ের কথা মনে থাকে না। এমন শারীরিক অসামর্থ্য নিয়ে রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয় বলেই তিনি ইস্তফা দিয়েছেন।

নিজের ইস্তফাপত্রে চুপ্পু উল্লেখ করেছেন, তাঁর হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে এবং নতুন করে অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি শনাক্ত হয়েছে। শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজনে তিনি এই ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাক্টিভ’ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রক্রিয়াটি তাঁর কাছে ছিল বিস্ময়কর। তিনি একাধিকবার বলেছেন, এর জন্য তাঁকে কোনো লবিং বা প্রতিযোগিতা করতে হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘কপালে যে আল্লাহ এত বড় জিনিস লিখে রাখছে, এটা কেমন করে বলব বলেন?’

এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জানতেন, গোলমাল থেকে ‘গোল’ বাদ দিয়ে নিজের বশ মানা ‘মাল’ নিতে হয়। চুপ্পু নিজেই জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের তিন মাস তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সালাম করতে গেলে তিনি বিব্রত বোধ করতেন এবং পা সরিয়ে নিতেন। পরে চুপ্পু বুঝতে পারেন, ততদিনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নাম প্রধানমন্ত্রীর মনে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। এই কদমবুসি কালচার যে ক্যারিয়ার কামানোর কৌশল, তা চুপ্পু ভালোভাবেই জানতেন।

বিচারক থাকা, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, এস আলম গ্রুপের পরিচালক এবং ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তিনি পর্দার আড়ালে থেকে ঝড় তুলতেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর পাবনার এক জনসভায় ঝড় ওঠার সময় এসএসএফ সদস্যকে ধমক দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ঝড় তো আমিই তুলছি।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর বঙ্গভবনে বসে তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন। কিন্তু কয়েক মাস পরই তিনি দাবি করেন, পদত্যাগপত্র তাঁর কাছে নেই। সম্প্রতি লন্ডনে চিকিৎসার সময় দিল্লিপ্রবাসী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর টেলিফোনে কথা হওয়ার খবরও গণমাধ্যমে আসে। এরপরই তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

চুপ্পুর দাবি, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন কাজের দায়মুক্তি তাঁর প্রাপ্য। কিন্তু দুবাইয়ে অর্থ পাচার বা মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’-এর মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে এই দায়মুক্তি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে চুপ্পুর এই পদত্যাগ আপাতদৃষ্টিতে ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাক্টিভ’ মনে হলেও, এটি নিঃশব্দে নিঃশেষ হওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়।