সাহাবিদের মতপার্থক্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে আমাদের শিক্ষণীয়

প্রকাশিত: ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০২৬

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবিদের মধ্যকার মতপার্থক্য এবং তা থেকে আমাদের শিক্ষণীয় দিকগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জীবদ্দশায় কোনো বিষয়ে দ্বিমত হলে সাহাবিরা সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে চলে যেতেন। তবে তাঁর ইন্তেকালের পর সময় যত গড়িয়েছে, নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়ে স্কলারদের মধ্যে মতপার্থক্য ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে এই মতপার্থক্য যখন সীমার মধ্যে থাকে, তখন তা সৌন্দর্য হিসেবে প্রকাশ পায়; কিন্তু তা সীমা লঙ্ঘন করলে বিপর্যয় ডেকে আনে।

বনু কুরাইজা অভিযানের সময়কার একটি ঘটনা সাহাবিদের মতপার্থক্যের চমৎকার উদাহরণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন, বনু কুরাইজায় না পৌঁছা পর্যন্ত কেউ যেন আসরের নামাজ না পড়ে। পথে আসরের নামাজের সময় হয়ে গেলে সাহাবিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যান। একদল আক্ষরিক অর্থ ধরে বনু কুরাইজায় গিয়েই নামাজ আদায়ের পক্ষে ছিলেন। অন্যদল মনে করেন, দ্রুত পৌঁছানোর তাগিদ দিতেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ওমন কথা বলেছিলেন, তাই তারা পথেই নামাজ আদায় করে নেন। বোখারি শরিফের ৪১১৯ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) উভয় পক্ষের যুক্তি শুনে কোনো দলের প্রতিই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি এবং কাউকে ভুল বলেননি।

আরেকটি ঘটনা জাতুস সালাসিল যুদ্ধের। তীব্র শীতের এক রাতে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রা.)-এর স্বপ্নদোষ হয় এবং তাঁর গোসল ফরজ হয়। ঠান্ডায় শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কায় তিনি গোসল না করেই ফজরের নামাজের ইমামতি করেন। এতে অন্য সাহাবিরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিচার দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমর ইবনুল আস (রা.) পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতের 'তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করো না' অংশটি উল্লেখ করেন। আবু দাউদের ৩৩৪ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, তাঁর যুক্তি শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) হেসে দেন এবং কোনো নিন্দা না করে যৌক্তিক মতপার্থক্যের অনুমোদন দেন।

ইসলামের দুই মহান খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) এবং হযরত উমর (রা.)-এর মধ্যেও বহু বিষয়ে মতপার্থক্য হতো। বদর যুদ্ধের বন্দীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আবু বকর (রা.) বন্দীদের মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দেন, যাতে তারা পরে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পান। অন্যদিকে উমর (রা.) কঠোর শাস্তিস্বরূপ তাদের শিরচ্ছেদের প্রস্তাব করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের এই ভিন্নমতকে চারজন নবীর স্বভাবের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি আবু বকরকে ইবরাহিম (আ.) ও ঈসা (আ.) এবং উমরকে নুহ (আ.) ও মুসা (আ.)-এর সঙ্গে তুলনা করেন। মুসনাদে আহমাদের ৩৬৩২ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুক্তিপণের সিদ্ধান্ত নিলেও আল্লাহ তাআলা সুরা আনফালের ৬৭ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে উমর (রা.)-এর মতকে সমর্থন করেন। তাসত্ত্বেও উমর (রা.) কখনো আবু বকর (রা.)-কে উপহাস বা সমালোচনা করেননি, বরং তাঁরা মিলেই কাজ করেছেন।

বনু তামিম গোত্রের প্রতিনিধি নির্বাচনের সময়ও এই দুই সাহাবির মধ্যে তীব্র তর্কাতর্কি হয় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনেই তাঁদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়ে যায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা সুরা হুজুরাতের ২ নম্বর আয়াত নাজিল করে নবীর সামনে উচ্চস্বরে কথা বলতে নিষেধ করেন। বোখারি শরিফের ৪৮৪৫ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, এই নির্দেশ আসার পর উমর (রা.) এতটাই নিচু স্বরে কথা বলতেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে তা শোনার জন্য দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতে হতো। সাহাবিদের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মতপার্থক্য পরিচালনার পদ্ধতি আজ আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।

উমর (রা.) মত দিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এরাই তো আপনাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে, এরাই তো আপনাকে অবিশ্বাস করছে। (এখন তাদেরকে কিসের ক্ষমা) সুতরাং, আপনি তাদের শিরচ্ছেদ করুন।’ দুজন সিনিয়র সাহাবি দুই ধরনের মত দিচ্ছেন। একজন বলছেন ক্ষমা করার কথা, তো আরেকজন বলছেন শাস্তি দেবার কথা। কিছুক্ষণ পর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ কারও হৃদয়কে এতটা কোমল বানিয়েছেন যা দুধের মতো, আবার কারও হৃদয়কে এতটাই কঠিন বানিয়েছেন যা পাথরের মতো। আবু বকর, তুমি হলে ইবরাহিমের (আ.) মতো, যিনি বলেছিলেন, ‘যে আমার অনুসরণ করেছে নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ইবরাহিম : ৩৬)। আবার আবু বকর, তুমি হলে ইসার (আ.) মতো। যিনি বলেছিলেন, ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা মায়িদা : ১১৮)।