জনবহুল বাংলাদেশে কেন প্রকট হয়ে উঠছে দক্ষ জনবলের অভাব? প্রকাশিত: ১২:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২৬ ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশে সংখ্যাগত দিক থেকে জনসংখ্যা বাড়লেও মানসম্মত দক্ষ জনবলের অভাব এখন সর্বত্র আলোচনার বিষয়। রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতিশীল নীতিনির্ধারকের চেয়ে স্লোগানদাতার আধিক্য, অর্থনীতিতে উদ্ভাবকের অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি খাতেই পেশাদারিত্বের সংকটের কারণে এই ঘাটতি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং যোগ্যতার চেয়ে তদবির বা রাজনৈতিক সংযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতিই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, দক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব না দেওয়াই মূল সমস্যা। তার মতে, দক্ষতা কেবল সার্টিফিকেটে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাত্ত্বিক জ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সমস্যার সমাধানমূলক চিন্তার সমন্বয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও শিক্ষার মান বাড়েনি। এছাড়া পেশাজীবী সংগঠনগুলোও অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের মতো আচরণ করছে, যা পেশাদারিত্বের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান একই সুরে কথা বলেছেন। তারা জানান, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা দক্ষ মানুষ তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ও কারিগরি জ্ঞানের অভাব তাদের চাকরির বাজারে পিছিয়ে দিচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিতে হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তৈরি পোশাকশিল্পের মতো খাতে ব্যবস্থাপনার উচ্চপদে বিদেশি কর্মী নিয়োগের হার প্রায় ২৮ শতাংশ, যেখানে দক্ষ জনবল তৈরিতে ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে এই সংকট নিরসনে ৮১ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান রিস্কিলিং কর্মসূচির ওপর জোর দিচ্ছে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ কর্মক্ষম, যার মধ্যে ৫৫ শতাংশ তরুণ। তবে দক্ষ জনবল তৈরিতে ৬২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো পিছিয়ে আছে। ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২৩ শতাংশ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ ৬ হাজার, যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় আটগুণ বেশি। আইএলও-এর তথ্যমতে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের প্রায় ৪১ শতাংশই শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের (এনইইটি) বাইরে রয়েছে, যা বৈশ্বিক গড় ২২ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমান কর্মীবাহিনীর ৪০ শতাংশের দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণে পাঠ্যক্রমে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বাড়ানো, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ স্থাপন এবং নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। দ্রুত এই কাঠামোগত পরিবর্তন না আনলে দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী বা 'জনমিতিক লভ্যাংশ' দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। SHARES অন্যান্য বিষয়: কর্মসংস্থানদক্ষতাবাংলাদেশশিক্ষাব্যবস্থাশ্রমবাজার