জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬: আইনি ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের বিশ্লেষণ

প্রকাশিত: ১২:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২৬

বাংলাদেশে জুয়া-সংক্রান্ত অপরাধ দমনে দীর্ঘদিন ধরে দেড়শ বছরের পুরনো ব্রিটিশ আমলের 'দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট ১৮৬৭' ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। সেই প্রাচীন আইনে কেবল নির্দিষ্ট স্থানে সশরীরে বসে তাস বা লটারির মাধ্যমে জুয়া খেলাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো, যা আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে হওয়া জুয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য ছিল অপর্যাপ্ত। এই আইনি সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে প্রণয়ন করা হয়েছে নতুন 'জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬'। নতুন এই আইনে অনলাইন জুয়া, দূরবর্তী জুয়া, বেটিং, বাজিকর, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভুয়া ও ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, মিরর সাইট এবং ভিপিএনসহ মোট ২৪টি আধুনিক বিষয়কে নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যাতে অপরাধীদের আইনি ফাঁকফোকর গলে বের হওয়ার সুযোগ না থাকে।

নতুন এই আইনের বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও কার্যকারিতা নিয়ে কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি জানান, নতুন আইনে অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য করায় অপরাধীদের মধ্যে আইনি ভয় তৈরি হবে, যা পূর্বে সাধারণ জুয়া আইনে ছিল না। তবে তিনি কিছু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেছেন। তার মতে, আদালতে ডিজিটাল লগের যেমন ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রানজেকশন, আইপি অ্যাড্রেস, ভিপিএন লগ-এর আইনি গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং ফরেনসিক ল্যাবের সনদ ছাড়া চতুর অপরাধীদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় খালাস পাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এছাড়া, পুলিশকে ওয়ারেন্ট বা আদালতের অনুমতি ছাড়া তল্লাশি ও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার যে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার অপব্যবহার রোধে জবাবদিহিতার ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, সহজলভ্যতা ও ছদ্মনাম ব্যবহারের সুযোগ থাকায় মানুষ এখন অফলাইন জুয়ার চেয়ে অনলাইন জুয়ায় বেশি জড়িয়ে পড়ছে। তিনি কেবল গ্রেফতার বা শাস্তির ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত আইনি, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, অনলাইন জুয়া কেবল তরুণ সমাজকে ধ্বংস করছে না, বরং হুন্ডি ও ব্লকচেইনের আড়ালে দেশের অর্থনীতি থেকেও কোটি কোটি টাকা পাচার করছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা নতুন আইনের শতভাগ বাস্তবায়নে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করেছেন। তিনি জানান, জুয়ার মূল হোতারা দেশের বাইরে থাকায় এবং সার্ভারগুলো এমন দেশে হোস্ট করায় তাদের ধরা বেশ জটিল। এছাড়া, ক্রিপ্টোকারেন্সির বেনামী লেনদেন এবং ডাইনামিক ডোমেইন বা মিরর সাইট ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধীরা বিটিআরসির ব্লকিং সিস্টেমকে ফাঁকি দিচ্ছে। এই সমস্যা মোকাবিলায় তিনি ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন, এআই-ভিত্তিক কনটেন্ট ফিল্টারিং, ফিনটেক মনিটরিং এবং ডিএনএস হাইজ্যাকিং প্রতিরোধের সুপারিশ করেছেন। একই সাথে তিনি ইন্টারপোল বা আন্তর্জাতিক সাইবার ক্রাইম অ্যালায়েন্সের সাথে সমন্বয় করে একটি সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার অনলাইন জুয়াকে একটি গুরুতর মানসিক ব্যাধি বা 'গ্যাম্বলিং ডিজঅর্ডার' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, জুয়ার আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে ঋণগ্রস্ততা ও চরম অবসাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই আইনি কঠোরতার পাশাপাশি পারিবারিক নজরদারি, ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানো এবং চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি জুয়ামুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।