মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহে কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রকাশিত: ৩:০৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২৬ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ সামরিক জোট ‘মক্কা চুক্তিতে’ যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আগ্রহ দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে এক বড় ধরনের পরীক্ষায় ফেলতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক জোটে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেবল প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেই নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তির সঙ্গেও ঢাকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণকে জটিল করে তুলতে পারে। সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানানোর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর বলেছিলেন, “আমরা মক্কা নিয়ে তো সবসময় আলাদা একটা জায়গা, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে, পশ্চিম এশিয়ায় একটা যদি হয়, যদি ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে একটা নিরাপত্তা চুক্তি হয়, তাহলে ওখানে তো অস্বাভাবিক না যাওয়া। দেখা যাক, বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।” এই আলোচনার মধ্যেই আগামী ২৭ আগস্ট জেদ্দায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ওআইসির মন্ত্রী পর্যায়ের জরুরি সভায় যোগ দিতে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় এই চুক্তিটি সই করে সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ তিন দেশ—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। মূলত ন্যাটো (NATO)-র যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির আদলে গড়ে তোলা এই চুক্তির মূল শর্ত হলো, সদস্যভুক্ত যেকোনো একটি দেশে সশস্ত্র হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত এবং ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই এই জোট গঠিত হয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান, ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির দেশ তুরস্ক এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের এই জোটটি অন্য দেশের জন্যও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে আঙ্কারা। চুক্তির ঘোষণায় সদস্য দেশগুলো নিজেদের যৌথ নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নিজেদের অঞ্চল ও অঞ্চলের বাইরে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগে যৌথভাবে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা। সাধারণত বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বলয়ে সরাসরি অংশ না নিয়ে সবার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে থাকে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে সামরিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিলে এই নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশ কোনো সামরিক ব্লকে যোগ দিলে তারা কোন পক্ষে অবস্থান করছে, সেই প্রশ্নটি এড়ানো কঠিন হবে। এটি ভারত ছাড়াও চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। সম্পর্কগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে না গেলেও বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনেও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে টানাপড়েন চলছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারেক রহমান ভারত সফর করবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকার করা অনুরোধের জবাবে নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর বাংলাদেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে মক্কা চুক্তি নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে তারা পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করা কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়াকে নয়াদিল্লি সহজভাবে নাও নিতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে যুক্ত হওয়ার ধারণা বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, কারণ এই অর্থনীতি বিশ্বজুড়ে অংশীদারদের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ যদি এই জোটে যোগ দেয় তবে ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ অখুশি হবে, তবে ঢাকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভিত্তি কেবল সেটি হওয়া উচিত নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। SHARES অন্যান্য বিষয়: পররাষ্ট্রনীতিবাংলাদেশ ভারত সম্পর্কভূ-রাজনীতিমক্কা চুক্তিসামরিক জোটহুমায়ুন কবীর