পণ্য পরিবহনে ৪ হাজার কোটি আয়ের সুযোগ, প্রকল্পের পেছনে ছুটছে লোকসানি রেল প্রকাশিত: ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (19 September 2026) তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে রেলওয়ের আয়ের প্রধান উৎস পণ্য পরিবহন হলেও বাংলাদেশে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। ইঞ্জিন ও ওয়াগনের তীব্র সংকট এবং সংশ্লিষ্টদের অদূরদর্শিতায় ধুঁকছে দেশের রেলওয়ের পণ্য পরিবহন খাত। প্রতিদিন ২৫টি মালবাহী ট্রেন চালানোর সুযোগ থাকলেও সক্ষমতার অভাবে সপ্তাহে মাত্র ৩ থেকে ৪টি ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে। অথচ যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় পণ্যবাহী ট্রেনের পরিচালন ব্যয় প্রায় ৮০ শতাংশ কম এবং আয়ও অনেক বেশি। লাভজনক এই খাতে নজর না দিয়ে কর্তৃপক্ষের সব ঝোঁক কেবল নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের দিকে। ফলে পণ্য পরিবহন খাত থেকে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা আয়ের সুযোগ থাকলেও গত অর্থবছরে এ খাত থেকে এসেছে মাত্র ১৫০ কোটি টাকা। বিপুল সম্ভাবনাময় এই খাতটিকে অবহেলা করার কারণে প্রতিবছর রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থাটিকে আড়াই হাজার কোটি টাকার বিশাল লোকসান গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে মোট অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহণের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ রেলপথে পরিবাহিত হয়। বিগত ১৮ বছরে রেলওয়ে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও এই দীর্ঘ সময়ে পণ্য পরিবহন থেকে বার্ষিক আয় বেড়েছে মাত্র ৩৪ কোটি টাকা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পণ্য পরিবহণে রেলের আয় ছিল ১২৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা ১৮ বছর পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রক্ষেপণে ধরা হয়েছে মাত্র ১৬৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. সামছুল হক এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রেল কর্তৃপক্ষ মূলত চায় না প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হোক। ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশ মালবাহী ট্রেন পরিচালনা করে লাভবান হচ্ছে। রেলওয়ে শুধু মালবাহী ট্রেন পরিচালনার মাধ্যমেই লোকসান ঘুচিয়ে লাভজনক হতে পারে। তারপরও সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রকল্পের দিকেই দৌড়াচ্ছেন। তিনি মনে করেন, এখনো সময় আছে, পণ্য পরিবহণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রেলকে সবচেয়ে লাভবান করা সম্ভব। রোলিংস্টক দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রেলপথে পণ্য পরিবহণের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পর্যাপ্ত ইঞ্জিন ও কোচ পেলে সপ্তাহে অন্তত ১৭৫টি ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। একটি যাত্রীবাহী ট্রেন একবার গন্তব্যে গেলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় হলেও একটি মালবাহী কিংবা কনটেইনার ট্রেনে আয় হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। বর্তমানে যে রেলপথ রয়েছে, পুরোটা ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ হয়ে গেলে এ পথে প্রতিদিন অন্তত শতাধিক ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব। শতাধিক ট্রেন পরিচালিত হলে এবং একটি ট্রেনে গড়ে ১২ লাখ টাকা আয় হলে বছরে ৪ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা আয় করতে পারবে রেলওয়ে। তবে রেলওয়ে আইসিডি ও পরিবহণ দপ্তরের তথ্য বলছে, রেলে কনটেইনার পরিবহণ প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে। গত জুলাই মাসে ২৬ হাজার ৪১০ টনের পরিবর্তে পণ্য পরিবহণ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৮২ টন। রোলিংস্টক দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রায় ৭৫ শতাংশ আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন দিয়ে মালবাহী ট্রেন পরিচালনার চেষ্টা চলছে, যা যে কোনো সময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তিনি আরও জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার লাগেজ ভ্যান ও মৌসুমভিত্তিক স্পেশাল ট্রেন ক্রয় বাবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খরচ করেছে, যা টেকসই হয়নি এবং এখন রেলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই ৫০০ কোটি টাকায় অন্তত ১৮টি ইঞ্জিন কেনা সম্ভব হতো, যা দিয়ে প্রায় ৩০টি মালবাহী ট্রেন পরিচালনা করা যেত। ইঞ্জিন ও কোচের ভয়াবহ স্বল্পতার কারণে বাধ্য হয়ে পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিন দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ে মার্কেটিং ও করপোরেট প্ল্যানিং দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, এ দপ্তরকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না। সবার নজর প্রকল্প গ্রহণ আর বাস্তবায়নের দিকে। কারণ একটাই, পণ্য পরিবহনের আয় থেকে দুর্নীতি ও লুটপাট করা যায় না। রেলপথ নির্মাণসহ পরিকল্পনাহীন প্রকল্প থেকে লুটপাটের সুযোগ থাকে বলেই সবার নজর সেদিকে থাকে। এদিকে কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) স্বাভাবিক কার্যক্রম তীব্র সংকটের মুখোমুখি হয়ে প্রায় অকেজো অবস্থায় রয়েছে। গাজীপুরের ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ প্রকল্পটির পরিকল্পনা এক দশকেরও বেশি আগে ২০১২ সালে নেওয়া হলেও এখনো কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুশাসন অনুযায়ী, মাল পরিবহণের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন ওয়াগন ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, আইসিডি ও লজিস্টিকস হাব নির্মাণ এবং বাস্তবায়নাধীন মেগা রেল প্রকল্পগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, রেলপথে পণ্য পরিবহণ বাড়াতে বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন-ওয়াগন ও রোলিংস্টক সামগ্রী নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে এ খাতে আয় বাড়ানো সম্ভব। ব্যবসায়ী মহলকে রেলমুখী করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সার্বিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে পণ্য পরিবহণেই হাজার কোটি টাকার বেশি আয় সম্ভব হবে। রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, মোট পণ্যের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রেলে পরিবহণ করতে পারলে বছরে শুধু পণ্য পরিবহণেই ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় করা সম্ভব। অন্যদিকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, আমাদের চেষ্টার কমতি নেই, কিন্তু আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন-কোচ-ওয়াগন দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন। তবে রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের পুরো রেলপথ ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ হচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রেন বাড়াতে আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। লোকসান কমাতে পণ্যবাহী ট্রেনের বিকল্প নেই। এদিকে রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম ক্ষোভ রয়েছে ব্যবসায়ী মহলে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার মতো প্রতিষ্ঠান বুকিং দিয়েও জ্বালানিবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না। পণ্য আমদানিকারক ইমরান চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, রেলপথে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে হাজারও ঝামেলা লেগেই থাকে। নির্ধারিত সময়ে কখনোই পণ্য গন্তব্যে পৌঁছায় না। কমলাপুর আইসিডির অবস্থাও নাজুক, ওখানটা যেন যানজটের একটি উৎপত্তিস্থল। তার অভিযোগ, রেলের একটি অসাধু চক্র বাস ও ট্রাক-লরি মালিকদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই রেলপথে পণ্য পরিবহণ ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। SHARES অন্যান্য বিষয়: ইঞ্জিন সংকটপণ্য পরিবহনবাংলাদেশ রেলওয়েমেগা প্রকল্পরেলওয়ের লোকসানরেলপথ মন্ত্রণালয়