কল্পলোকে সাংবাদিকদের জমি বিক্রিতে অনিয়ম, স্থগিতাদেশ আদালতের প্রকাশিত: ১১:৩৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২৬ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বরাদ্দ দেওয়া ৪০ দশমিক ৬২ কাঠা জমি বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কল্পলোক আবাসিক এলাকায় সাংবাদিকদের আবাসনের জন্য বরাদ্দকৃত এই জমি বিক্রির প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা থাকায় চট্টগ্রামের পঞ্চম সিনিয়র সিভিল জজ আদালত গতকাল রোববার জমি হস্তান্তর ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এসব অভিযোগের মধ্যে গতকাল রোববার (১৮ অক্টোবর) জমি বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন চট্টগ্রামের পঞ্চম সিনিয়র সিভিল জজ আদালত। আদালত সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি বিবাদীদের ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য নোটিশ দিয়েছেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খায়েরুন্নেছা আকতার আদালতের এই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এসব মূল্যদাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি শর্ত উপেক্ষা করে এবং সমবায় মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন ছাড়াই এই জমি বিক্রির চেষ্টা করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের (চমেসাস) নামে বরাদ্দ দেওয়া এই জমি বিক্রির বায়নানামা গত ৩ ফেব্রুয়ারি নিবন্ধিত হয়। দলিল নম্বর ৬৪৮/২০২৬ অনুযায়ী, জমিটির মূল্য দেখানো হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। তবে সদস্যদের একাংশের দাবি, জমিটির প্রকৃত বাজারমূল্য ৫০ কোটি থেকে ৭০ কোটি টাকার কাছাকাছি। এই হিসাব অনুযায়ী বায়নানামায় দেখানো মূল্যের সঙ্গে প্রায় ২০-২৫ কোটি টাকার বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। জমিটির বায়নানামায় মূল্য দেখানো হয়েছে ২৫ কোটি টাকা, যদিও প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৪৫ কোটি টাকা বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তিনি বলেন, ৮৪/২০২৬ নম্বর মামলায় রোববার নথি উপস্থাপন করে জমি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানানো হয়। নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় দলিল সম্পাদনের পর আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল। জমির বায়না বাবদ ১৭ কোটি টাকা লেনদেন হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় ইসলামী ব্যাংকের আসকারদিঘী পাড় শাখায় একটি ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পায়। চমেসাস-এর নামে খোলা এই হিসাবে মাত্র ৫০ হাজার টাকা প্রারম্ভিক জমার বিপরীতে এক বছরের কম সময়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। অথচ সমিতির মূল ব্যাংক হিসাব রয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব শাখায়। রহস্যময় এই হিসাবে জমি বিক্রির অগ্রিম টাকা লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করছেন সমিতির বঞ্চিত সদস্যরা। তবে ৬৭ জনের অন্তর্ভুক্তি ও অর্থ বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে সমিতির সদস্যদের মধ্যে আপত্তি রয়েছে। জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় গত ২১ সেপ্টেম্বর জমি বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে চিঠি দেয়। ২০০৬ সালে সিডিএ সাংবাদিকদের আবাসনের জন্য এই জমি বরাদ্দ দিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে সাংবাদিকরা তাদের বসবাসের জন্য কোনো জমি নেই মর্মে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অঙ্গীকারনামা দিয়েছিলেন। এরপর গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ফ্ল্যাট নির্মাণের শর্তে জমিটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের শর্তানুযায়ী এটি একটি ‘ব্লক অ্যাপার্টমেন্ট’ প্রজেক্ট হওয়ার কথা ছিল এবং খালি জমি হিসেবে বিক্রির কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ভবন নির্মাণ না হওয়ায় বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটি জমিটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। ৪৩ সদস্যের আবেদনে বরাদ্দ, ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা ছিল সবার। পরে ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর দেওয়া বরাদ্দপত্রে জমির শ্রেণি উল্লেখ করা হয় ‘ব্লক অ্যাপার্টমেন্ট’। তবে সমিতির অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে দীর্ঘদিনেও সেখানে ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। হিসাবটির নাম CHATTOGRAM METROPOLITON SANGBADIK SOMOBAY SOMITI LIMITED। সমিতির মোট সদস্য ১০৫ জন হলেও অভিযোগ রয়েছে যে, জমি বিক্রির বিষয়টি থেকে ৩৮ জন সদস্যকে কৌশলে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অবশিষ্ট ৬৭ জনকে আবাসন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত দেখিয়ে তাদের মধ্যে বিক্রির টাকা ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যরা অবিলম্বে বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার কার্যবিবরণী, সাধারণ সভার অনুমোদন এবং ব্যাংক হিসাবের লেনদেনের স্বচ্ছতা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তারা চান যে, জমি বিক্রির অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং কোনো সদস্য ব্যক্তিগতভাবে কোনো আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন কি না, তা সঠিকভাবে তদন্ত করা হোক। জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে সিডিএ চেয়ারম্যান, সাবরেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়ে জমিটির নিবন্ধন ও হস্তান্তর বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। সমবায় আইন, ২০০১-এর ৪৮(২) ধারা অনুযায়ী সমিতির কার্যক্রম পরিদর্শনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা পার্থ কান্তি বিশ্বাসের নথিতেও এই অনিয়ম উঠে এসেছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন ছাড়া সমিতির সম্পত্তি বিক্রির কোনো আইনগত অধিকার ব্যবস্থাপনা কমিটির নেই। আদালত আবেদনটি বিবেচনায় নিয়ে তফসিলে বর্ণিত সম্পত্তি হস্তান্তর না করার নির্দেশ দেন। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, জমি বিক্রির অনুমোদন যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটিকে অন্ধকারে রেখে এই বায়নানামা সম্পন্ন করা হয়েছে। এতে করে সিডিএর মূল উদ্দেশ্য এবং সদস্যদের স্বার্থ চরমভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় তাই মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত জমিটির যেকোনো ধরনের নিবন্ধন বা হস্তান্তর প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার জোর দাবি জানিয়েছে। ভবনের নকশা সিডিএর অনুমোদন নিতে হবে। জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের বক্তব্য, প্রাথমিক পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য ও নথির ভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এদিকে সমিতির সদস্যদের একটি বড় অংশ পুরো বিষয়টির বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়েছেন। তাদের মতে, জমি বরাদ্দের শর্ত ভঙ্গের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তা দূর করা জরুরি। আদালত এখন পর্যন্ত বিবাদীদের জবাব তলব করায় পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন সমিতির সদস্যরা। SHARES গণমাধ্যম বিষয়: অনিয়মআদালতচট্টগ্রামজমিসাংবাদিকসিডিএ