ব্রাজিলে লুলার জয়ে মুদ্রার দরপতন ও শেয়ারবাজারে ধস

প্রকাশিত: ৮:০৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার অপ্রত্যাশিত জয়ের পর দেশটির অর্থনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই এক দিনে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ব্রাজিলের মুদ্রা রিয়ালের দর ৮ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৪১-এ নেমে গেছে, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ একদিনের দরপতন। একই সঙ্গে দেশটির প্রধান শেয়ারবাজার সাও পাওলো স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক বোভেসপা ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যাওয়ায় একপর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে লেনদেন স্থগিত রাখতে হয়। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির পর বোভেসপার জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে খারাপ দিন।

রোববার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলা ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, কারাবন্দী সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ৪৫ বছর বয়সী ছেলে ও কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো পান ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। নির্বাচনের এই ফল সামনে আসার পরপরই রিয়ালের অবমূল্যায়নের পাশাপাশি কিছু সরকারি বন্ডের সুদের হার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে; ২০৩৬ সালে মেয়াদ পূর্ণ হতে যাওয়া ডলারে ইস্যুকৃত ব্রাজিলীয় বন্ডের সুদের হার ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশে পৌঁছায়।

নির্বাচনের আগে ফ্লাভিও বলসোনারোর ব্যবসাবান্ধব নীতি, বড় বাজেট ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি ও সুদের হার কমানোর আশায় বাজারে সূচকের যে ঊর্ধ্বগতি দেখা গিয়েছিল, তা এই পতনে অনেকটাই ধুয়েমুছে গেছে। চলতি বছর নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর ১০ শতাংশ এবং ডলারের হিসাবে শেয়ারবাজারের সূচক ৩৮ শতাংশ বেড়ে বিশ্বসেরা শেয়ারবাজারগুলোর কাতারে জায়গা করে নিয়েছিল। তবে লুলার জয়ের পর চিত্র বদলে যায়। নির্বাচনী প্রচারণায় লুলা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিনামূল্যে গণপরিবহন, ব্যক্তিগত ঋণ মওকুফ ও সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বাড়ানোর মতো ব্যয়বহুল প্রতিশ্রুতি দেন, যা বাজার গবেষক ও সমালোচকদের চিন্তিত করে তুলেছে।

ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে লুলা কর আদায় বৃদ্ধি ও সরকারি ব্যয় বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করেছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটির রাজস্ব ঘাটতি মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে। একই সঙ্গে ব্রাজিলের সরকারি ঋণ ইতিমধ্যেই জিডিপির প্রায় ৮৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা কোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি সামলাতে ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশে উন্নীত করে রেখেছিল। অতিরিক্ত সুদের কারণে ব্রাজিলে নতুন বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর ঋণের বোঝা বেড়েছে।

বাজারের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান আরবিসি ব্লুবের সিনিয়র সভরেন স্ট্র্যাটেজিস্ট গ্রাহাম স্টক মন্তব্য করেন, স্থানীয় বাজারের এই ব্যাপক দরপতন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে ব্রাজিলের সরকারি অর্থব্যবস্থায় সমন্বয় সাধনই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। ডয়চে ব্যাংকের গ্লোবাল ম্যাক্রো প্রধান জিম রিড জানান, বিনিয়োগকারীরা ফ্লাভিও বলসোনারোর জয় ধরে নিয়েই তাঁদের সব হিসাব ও পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। ফেডারেটেড হার্মিসের শেয়ারবাজার বিশ্লেষক আলদো রুইজ সতর্ক করে বলেন, লুলা যদি রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান না নেন, তবে উচ্চ সুদের হার বজায় থাকবে, যা রিয়ালের দর আরও কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর করতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, রক্ষণশীলদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দেশের কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে লুলার ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বেশ কঠিন হবে। এখন সবাই সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী নিয়োগের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।

সোমবার ব্রাজিলের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হয়েছে আর্থিক খাতকে। এই খাতের সূচক এক দিনেই ২২ শতাংশ পড়ে যায়। এর মধ্যে বিনিয়োগ ব্যাংক বিটিজি প্যাকচুয়ালের শেয়ারদর কমেছে ২৫ শতাংশ এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যাংকো দো ব্রাজিলের শেয়ারদর কমেছে ২৯ শতাংশ। মার্কিন শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্রাজিলের ডিজিটাল ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এক্সপির শেয়ারের দাম ৪৮ শতাংশ এবং ফিনটেক প্রতিষ্ঠান নুব্যাঙ্কের শেয়ারদর ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এ ছাড়া ব্রাজিলে বিস্তৃত ব্যবসা থাকা স্পেনের ব্যাংক সান্তান্দারের শেয়ার দরও ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।