উখিয়ায় ৪০ ঘণ্টায়ও নেভেনি গ্যাসের আগুন, চরম ভোগান্তিতে ৩৮০০ পরিবার

প্রকাশিত: ১১:১৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীতে গভীর নলকূপ খনন করতে গিয়ে ভূগর্ভস্থ গ্যাস থেকে লেগে যাওয়া আগুন ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় পার হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আগুনের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ঘটনার জেরে নিরাপত্তার স্বার্থে ইনানী থেকে মনখালী হয়ে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের প্রায় ৩ হাজার ৮০০ পরিবার চরম বিদ্যুৎহীনতায় পড়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং গ্যাসের উৎস ও ধরন চিহ্নিত করতে কাজ করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের স্থান থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চেষ্টার পরও নেভানো যায়নি। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ পরিবার। এদিকে গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি শনাক্তে নমুনা পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছে।

ঘটনাটির সূত্রপাত ঘটে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৭টা ২০ মিনিটে। উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোট ইনানী এলাকার ছোট ব্রিজ সংলগ্ন মো. আবদুল্লাহর বাড়ির আঙিনায়। জমির মালিক মোহাম্মদ আবদুল্লাহর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সেখানে একটি গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য প্রায় ১৫ দিন আগে খননকাজ শুরু করেন শ্রমিকেরা। তবে এক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা করেও পানির সন্ধান না মেলায় তারা কাজ বন্ধ রেখে চলে যায়। এর কিছুদিন পর খনন করা ওই কূপ থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরবর্তীতে পাশের বৈদ্যুতিক তার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট চেষ্টা চালিয়েও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়। অনবরত ভূগর্ভ থেকে উচ্চচাপে গ্যাস নির্গত হতে থাকায় পানি ও বালু ছিটিয়েও আগুন নেভানো যাচ্ছে না। উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম জানান, সাধারণ পাইপলাইনের গ্যাস হলে ভালভ বন্ধ করে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা যেত। কিন্তু এটি ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক উৎস হওয়ায় স্বাভাবিক পদ্ধতিতে আগুন নিভছে না।

বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের প্রাথমিক ধারণা, ভূগর্ভের উচ্চচাপের গ্যাস কোনো দুর্বল স্তর বা ফাটল দিয়ে ভূপৃষ্ঠে ভেসে উঠছে। এই গ্যাসে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে। বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিকুন আরহাম বলেন, আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার ধরন দেখে গ্যাসে উচ্চতর হাইড্রোকার্বন থাকার আলামত মিলছে, যা পরীক্ষাগারে নমুনার বিশ্লেষণের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, গ্যাসের চাপ অতিরিক্ত হওয়ায় মাটি বা বালিচাপা দিয়ে এক মুখ বন্ধ করলে তা অন্য স্থান দিয়ে বের হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। গ্যাসের সুনির্দিষ্ট চাপ ও নির্গমনের পরিমাণ পরিমাপ না করে এটি কত দিন জ্বলবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতেও প্রয়োজন পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ।

বাপেক্সের অনুসন্ধান বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জেবুন নাহার জানান, গত মঙ্গলবার থেকেই তাদের একটি প্রতিনিধি দল এলাকায় কাজ করছে। সংগৃহীত গ্যাসের নমুনা ঢাকার পরীক্ষাগারে নেওয়া হবে এবং এক থেকে দুই দিনের মধ্যে রাসায়নিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আগুনের ভয়াবহতা এবং সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনা করে স্থানীয় প্রশাসন অকুস্থলের ২০০ মিটার এলাকার মধ্যে জনসমাগম নিষিদ্ধ ও সীমিত ঘোষণা করেছে। ২০০ মিটার এলাকায় জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা। আগুনের ঝুঁকি বিবেচনায় ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে জনসমাগম না করার নির্দেশনা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার এলাকা খালি করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

আশেপাশের বসতবাড়ির বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, অধিবাসীদের জানমালের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলের ঠিক ওপর দিয়ে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইন থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থগিত রাখা হয়। এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের কোনো স্থায়ী সুপ্ত মজুত আছে কি না, তা বাপেক্সের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যাবে না। বর্তমানে ফায়ার সার্ভিস, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং উপজেলা প্রশাসনের যৌথ টিম সেখানে সার্বিক তদারকি করছে। এসময় আশপাশে থাকা বসতবাড়ির বাসিন্দাদেরও নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়াও ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিটের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা কাজ করছেন।

এদিকে ৩৩ কেভি প্রধান বিদ্যুৎ লাইনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় অচল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উখিয়া জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাইজার নূর জানান, বাপেক্সের পরামর্শ মেনে বিকল্প পথে প্রায় ৩০০ মিটার দীর্ঘ একটি নতুন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের কাজ বুধবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে। এই কাজ দ্রুত শেষ হলে প্রায় ৪ হাজার গ্রাহক পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ পাবেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। তবে আগুন না নেভায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। বিকল্প লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ।